পূণ্যের বসন্তকাল পবিত্র মাহে রমজান: এম সোলাইমান কাসেমী,

ইসলামে রোজা পালন শুধুমাত্র কতগুলি নিষেধাজ্ঞার সমষ্টিই নয় যে, মানুষ পানাহার করবেনা, জৈবিক চাহিদা পূরণ করবেনা, পরনিন্দা করবেনা, সন্ত্রাসী কার্যকলাপে লিপ্ত হবে না। বরং এরই সাথে অাদেশাবলীও অন্তরর্নিহিত, যেমন রমজান মাস হলো ইবাদত,কুরঅান তিলাওয়াত,জিকির-তাসবিহ,পারস্পরিক সহানুভূতি সংবেদনশীলতার মাস। এ মাসে প্রতিটি নেক অামলের মর্যাদা বেড়ে যায় বহুগুণ। নবী কারিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি এ বরকতময় মাসে অাল্লাহর নৈকট্য লাভের অাশায় একটি নফল কাজ করবে সে যেন অন্য মাসের একটি ফরজ অাদায় করলো। অার যে একটি ফরজ অাদায় করলো সে যেন সত্তরটি ফরজ অাদায় করলো। এ মাস ধৈর্যের মাস। ধৈর্যের প্রতিদান হলো জান্নাত। এ মাস সহানুভূতি-সমবেদনার মাস। যে ব্যক্তি রোজা পালনকারীকে ইফতার করাবে সে রোজা পালন করার সম-পরিমাণ সাওয়াব পাবে। কিন্তু এতে রোজা পালনকারীর সাওয়াব কমবে না। রোজা পালনের সাথে অার এক বিশেষ অামল রয়েছে তারাবীহ’র নামাজ। এর প্রমাণে প্রিয়নবী (সা.) ইরশাদ করেন, ” অাল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর রোজা ফরজ করেছেন অার অামি তারাবীহ’র নামাজ পড়ার মাধ্যমে রাত্রি জাগরণ তোমাদের জন্যে সুন্নাত করেছি। যে ব্যক্তি অাল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্হাপন করে সাওয়াবের অাশায় তারাবীহ’র মাধ্যমে রাত্রি জাগরণ করবে অাল্লাহ তার অতীতের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন। ” এ দিকগুলো বিবেচনা করলে বলতে হয়, রমজান মাস হলো – ইবাদতের উৎসব, তিলাওয়াতের মওসুম, পূণ্যবান ও মুত্তাকী লোকদের জন্যে পূণ্যের বসন্তকাল, অাবেদ ও রিয়াজতকারীদের জন্যে ঈদ। অতএব, পূণ্যের এ বসন্তকালে প্রতিটি মুসলিম নিজেকে ইবাদতে বেশি বেশি নিমগ্ন রেখে উভয় জগতে সাফল্য অর্জন করা উচিত। অাল্লাহ অামাদের সেই তাওফিক দান করুন।

নিয়ামতপূর্ণ এ মোবারক মাসে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন তার রহমতের দরোজাসমূহ খুলে দেন। নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেছেন, তোমাদের সামনে রমজান মাস সমুপস্থিত। এটা অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ মাস। এ মাসের রোজা আল্লাহ্পাক তোমাদের ওপর ফরজ করেছেন। এ মাসে আকাশের দরোজাসমূহ উন্মুক্ত করে দেয়া হয় আর জাহান্নামের দরজাগুলো করে দেয়া হয় বন্ধ। এ মাসে বড় বড় শয়তানগুলোকে আটক করে রাখা হয়।
রোজাকে আরবিতে ‘সাওম’ বলে। সাওম-এর আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। শরীয়তের পরিভাষায় সুবহি সাদিক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজার নিয়তে যাবতীয় পানাহার এবং স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকার নাম সাওম। রোজা ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে অন্যতম। রমজান এমন একটি মাস, যার প্রথম দশক রহমতের দ্বারা পরিপূর্ণ, দ্বিতীয় দশক বরকতে পরিপূর্ণ এবং তৃতীয় দশক জাহান্নামের আজাব থেকে নাজাত ও মুক্তির জন্যে নির্ধারিত। সুতরাং যারা এমন একটি রহমত ও বরকতের মাস পেয়েও রোজা পালন করে সুফল লাভ করতে পারল না, তাদের জন্য দুঃসংবাদ ছাড়া আর কিইবা থাকে? রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘এ মাসে পরম করুণাময় মহান আল্লাহ্ তোমাদের প্রতি শুভ দৃষ্টি প্রদান করেন; তোমাদের সকল পাপরাশি ক্ষমা করে দেন এবং দোয়া কবুল করেন ও রহমত বর্ষণ করেন।’
কথা হলো, রমজানের প্রথম দশকে বান্দার প্রতি মহান রাব্বুল আলামিনের পক্ষ হতে কী রহমত বর্ষিত হয়? এর জবাবে হাদিস শাস্ত্রের বিভিন্ন প্রামাণ্য গ্রন্থে বর্ণিত বিষয়সমূহ হলো : ১. রোজাদার ব্যক্তিকে আল্লাহতা’লা রিজিকের সচ্ছলতা দান করেন, ২. ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে দেন, ৩. সাহ্রি ও ইফতার গ্রহণের প্রকৃত সওয়াব দান করেন, ৪. নেক কাজের প্রতিদান বহুগুণে বাড়িয়ে দেন, ৫. অগণিত ফেরেশতা রোজাদারের জন্যে মাগফিরাত কামনা করেন, ৬. শয়তানকে বন্দি রাখার কারণে রোজাদার ব্যক্তি কুমন্ত্রণা থেকে মুক্ত থাকেন, ৭. জান্নাতের সকল দরোজা উন্মুক্ত ও জাহান্নামের দ্বারসমূহ বন্ধ রাখা হয়, ৮. প্রতি রাতে অগণিত জাহান্নামীকে মুক্তি ও নিষ্কৃৃতি দেয়া হয়, ৯. রমজানের প্রত্যেক জুমার রাতে ওই পরিমাণ জাহান্নামীকে মুক্তি দেয়া হয়, যে পরিমাণ গোটা সপ্তাহে মুক্তিলাভ করেছে, ১০. রমজানের শেষ রজনীতে রোজাদারের গুণাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হয়, ১১. রমজান উপলক্ষে প্রতিদিন বেহেশত সুসজ্জিত করা হয়, ১২. রোজাদারের যে কোনো দোয়া (ইফতারের সময়) কবুল করা হয়, ১৩. রোজাদারগণ আল্লাহতা’লার সন্তুষ্টি লাভ করেন, ১৪. রোজাদারের দেহকে সকল পাপ হতে মুক্ত ও পবিত্র করা হয়, ১৫. প্রতিটি নফল ইবাদতের বিনিময়ে রোজাবিহীন মাসের ফরজ সমতুল্য পুণ্যদান করা হয়।

পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে : হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিলো তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর। যেন তোমরা পরহেজগারি অর্জন করতে পারো। (সূরা বাক্বারা ঃ ১৮৩) এ আয়াতের দ্বারা যেমন রোজার বিশেষ গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে, তেমনি মুসলমানদেরকে এ মর্মে সান্ত্বনা দেয়া হয়েছে যে, রোজা কষ্টকর ইবাদত বটে। তবে তা’ শুধু তোমাদের ওপরই ফরজ নয়, তোমাদের পূর্বের জাতিগুলোর ওপরও রোজা ফরজ ছিলো। কারণ, কোনো ক্লেশকর কাজে অনেক লোক একসঙ্গে জড়িত হয়ে পড়লে তা অনেকটা স্বাভাবিক এবং সাধারণ বলে মনে হয়। তাফসিরে রুহুল মা’আনীতে বলা হয়েছে, ‘হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে হযরত ঈসা (আ.) পর্যন্ত কোনো উম্মত বা শরীয়তই যেমনি নামাজ থেকে বাদ ছিলো না, তেমনি রোজাও সবার জন্যে ফরজ ছিলো। তবে হ্যাঁ, আমাদের রোজার সমগ্র শর্ত ও প্রকৃতিসহ আগেরকার উম্মতদের রোজা ছিলো না। রোজার বিভিন্ন ফজিলত হাদিসের বিভিন্ন স্থানে বিধৃত রয়েছে। হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ্তা’লা ইরশাদ করেছেন, রোজা আমার জন্যে আর আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব। অন্য এক হাদিসে রয়েছে : রোজাদার ব্যক্তির ক্ষুধার্ত পেটের আতুড়ি নির্গত মুখনিসৃত দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মেসক জাতীয় সুগন্ধি হতেও উত্তম। আট বেহেশতের মধ্যে ‘রাইয়ান’ নামক একটি বিশেষ বেহেশত শুধু রোজাদারদের জন্যেই তৈরি করা হয়েছে। এতে অন্য কারো প্রবেশাধিকার থাকবে না। এছাড়া রমজান মাসে প্রতিটি আমলের সাওয়াব বৃদ্ধি করা হয়। প্রতিটি নফলকে একটি ফরজ ও প্রতিটি ফরজকে ৭০টি ফরজের সমতুল্য করে আমলকারীকে সওয়াব প্রদান করা হয়। সারা বছর ধরে রমজান মাসের জন্যে বেহেশ্ত সাজানো হয়।

লেখক : অধ্যক্ষ এম সোলাইমান কাসেমী, ইসলামী চিন্তক ও গবেষক।

(Visited 19 times, 1 visits today)