মুসলমানদের “উন্নয়ন ও অগ্রগতি”র মাপকাঠি কী হওয়া উচিত?

সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া আযহারী: মুসলমানদের “উন্নয়ন ও অগ্রগতি”র মাপকাঠি কী হওয়া উচিত? মুসলমানদের দীর্ঘ ফ্লাইওভার, দীর্ঘ ব্রিজ, প্রচুর পাকা সড়ক, উচু বিল্ডিং কিংবা মেট্রোরেইলই কী উন্নয়নের মাপকাঠি?
ইদানীং বাংলাদেশের মুসলমানদের অনেকের মুখেই একটি কথা খুব বেশি শুনছি। “দেশের ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে, দেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে” “মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে গেছি আমরা”! “আমরা অনেক অগ্রগতি লাভ করেছি”। এমনকি অনেক আলিম উলামাও ইদানীং গলা ছেড়ে বলছেন, “দেশ এগিয়ে যাচ্ছে খুব দ্রুত”।

তো আসুন তাদেরকে জিজ্ঞেস করি “আপনাদের কাছে একটি জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির মাপকাঠি কী?” বড় বড় নদীর উপর বড় বড় ব্রিজ নির্মাণই কী উন্নয়নের মাপকাঠি? কতগুলো দীর্ঘ ফ্লাইওভার নির্মাণ কিংবা মেট্রোরেইল প্রকল্পের বাস্তবায়নই কী উন্নয়নের মাপকাঠি?

রাস্তাঘাটের ব্যাপক সংস্কারই কী উন্নয়নের মাপকাঠি? মানুষ এখন বিলাসীতা করার জন্য প্রচুর উপকরণ হাতের কাছেই পাচ্ছে, এসবের এভেইলেবিলিটিই কি উন্নয়নের মাপকাঠি?

বড় বড় শহরগুলোতে উচু উচু দালান নির্মাণ হচ্ছে, এগুলোই কী উন্নয়নের প্রতীক? বেশিরভাগ মানুষ তিনবেলা দুমুঠো খেতে পারছে, এটাই কী উন্নয়নের মাপকাঠি?

ডলারের রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন কিংবা ৪১ বিলিয়নে পৌঁছানোই কি উন্নয়নের মাপকাঠি? ফরেন রেমিট্যান্স আসছে প্রচুর কিংবা গার্মেন্টসের উপচে পড়া বাণিজ্যই কী উন্নয়নের মাপকাঠি?

প্রিয় মুসলিম ভাই ও বোনেরা! শুধুমাত্র বাহ্যিক বৈষয়িক এই ইট পাথরের উন্নয়নের সংকীর্ণ ও নৈতিকতা বিবর্জিত সংজ্ঞার সাথে “ইসলাম” তো দূরের কথা, এমনকি ইউরোপ আমেরিকার সেকুলারিজম বা ধর্মহীনতায় বিশ্বাসী অমুসলিমেরাও একমত না। আমরা মুসলমান হয়ে এসব সংজ্ঞার সাথে কী করে একমত হই? ইউরোপ আমেরিকার অমুসলিমেরাও আইনের শাসন, আইনের সঠিক প্রয়োগ, আইনের কাছে সবার সমান জবাবদিহিতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, জনগণের নিকট রাজনীতিবিদদের জবাবদিহিতা, জানমালের নিরাপত্তা এবং ঘুষ -দুর্নীতিমুক্ত, মিথ্যা, প্রতারণা, অনাচার-অবিচার, জুলুম-নির্যাতনমুক্ত সমাজব্যবস্থা ইত্যাদি গুণাবলী না থাকলে একটি দেশকে উন্নত দেশ হিসেবে বিবেচনা করে না। তাদের মতেও “ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল”এর সূচকে একদম নিচের দিকে থাকা কোন দেশ ইট পাথরের জংগল হলেও তাকে উন্নত দেশ বলা যায় না। সেখানে আমরা মুসলমান হয়ে মেনে নিচ্ছি উন্নয়নের এই মনগড়া নীতি নৈতিকতাহীন সংকীর্ণ সংজ্ঞাকে। আর আমরা আওয়াজ তুলছি দেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জরিপ বলছে, আমাদের দেশের ৮ শতাংশ পরিবার এখনো ক্ষুধা নিয়ে ঘুমুতে যায় শহরগুলোতে আর ১২ শতাংশ দরিদ্র পরিবার খাবার পায় না। কোন উন্নয়নের জোয়ারে আমরা ভেসে যাচ্ছি?

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা বলছেন,
كَمَا أَرْسَلْنَا فِيكُمْ رَسُولًا مِّنكُمْ يَتْلُو عَلَيْكُمْ آيَاتِنَا وَيُزَكِّيكُمْ وَيُعَلِّمُكُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُعَلِّمُكُم مَّا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُونَ
যেমন, আমি পাঠিয়েছি তোমাদেরই মধ্য থেকে তোমাদের জন্যে একজন রসূল, যিনি তোমাদের নিকট আমার বাণীসমুহ পাঠ করবেন এবং তোমাদেরকে পবিত্র করবেন; আর তোমাদের শিক্ষা দেবেন কিতাব ও তত্ত্বজ্ঞান (প্রজ্ঞা) এবং শিক্ষা দেবেন এমন বিষয় যা কখনো তোমরা জানতে না। (২ঃ১৫১)

উপরের এই আয়াতখানা যদি ভাল করে লক্ষ্য করেন তবে দেখবেন, প্রিয়নবী করিম ﷺকে আল্লাহ পাক প্রধান প্রধান যে কটি দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন সেগুলোর উল্লেখ আছে এখানে সুস্পষ্টভাবে। কুরআন মাজিদ আমাদেরকে তিলাওয়াত করে শুনানোর পরই হুজুর রাসূলুল্লাহ ﷺর দ্বিতীয় দায়িত্ব মানবজাতির প্রতি “তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করবেন”! এই আয়াতখানা ভিন্ন ভিন্ন বাক্যে কুরআন মাজিদে বেশ কয়েক জায়গায় এসেছে। কাজেই এই আয়াতখানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

হুজুর রাসূলুল্লাহ ﷺর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল এই মুসলিম জাতিকে পবিত্রতার শিক্ষা দেয়া। ভেতর ও বাহিরকে পবিত্র কিভাবে করতে হয় হুজুর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর ২৩ বছরের দাওয়াতী জীবনে সেই শিক্ষাই দিয়েছেন এবং তিনি সাহাবায়ে কেরামকে পবিত্র করে পরিশুদ্ধ এক জাতি গঠন করেন।

অতঃপর আল্লাহ পাক ঘোষণা করে দিচ্ছেন,
قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا
যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয়।
وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا
এবং যে নিজেকে কলুষিত করে, সে ব্যর্থ মনোরথ হয়। (৯১ঃ ৯-১০)

যে জাতি যত বেশি পরিশুদ্ধ সে জাতি তত বেশি উন্নত, সে জাতি তত বেশি সফলকাম।

উল্লেখ্য যে, আমি কখনোই দুনিয়াবী বা বৈষয়িক উন্নতিকে অগ্রাহ্য করছি না। আল্লাহ পাক যেখানে আখিরাতের কল্যাণের আগে দুনিয়ার কল্যাণ চাইতে শিখিয়েছেন, সেখানে দুনিয়াকে তুচ্ছ করার আমি কে? আল্লাহ পাক আমাদেরকে দোয়া করতে শেখাচ্ছেন,
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
হে আমাদের পরওয়ারদেগার! আমাদিগকে দুনিয়াতেও কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদিগকে দোযখের আযাব থেকে রক্ষা করুন। (২ঃ ২০১)

কাজেই দুনিয়াবি উন্নতি আমাদের “প্রয়োজন”। কিন্তু তা আখিরাতের বিনিময়ে নয়, কারণ আখিরাত আমাদের “গন্তব্য”৷ নিজেদের আখিরাতকে বিনষ্ট করে দুনিয়া অর্জন নয়৷ নিজেদের ভেতরের জগতকে কলূষিত করে দিয়ে দুনিয়া হাসিল কোনভাবেই কাম্য নয়৷

কারণ ইসলামের সফলতার মাপকাঠিই হচ্ছে “পরিশুদ্ধতা”। কাজেই যে জাতি যত বেশি পরিশুদ্ধ সে জাতি তত বেশি সফলকাম।

মিথ্যা, প্রতারণা, জুলুম, নির্যাতন, অন্যায়, অবিচার, খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি, অশ্লীলতা-বেহায়াপনা, খাদ্যে ভেজাল, সূদ-ঘুষ দুর্নীতি, চুরি ডাকাতি ছিনতাই ইত্যাদি বড় বড় সব দোষ থেকে ব্যাপকভাবে পরিশুদ্ধ জাতিই প্রকৃত অর্থে সফল জাতি, উন্নত জাতি। যেখানে আইনের চোখে সবাই সমান হবে, আইনের সঠিক ও স্বাধীন প্রয়োগ হবে। মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। সমাজের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সবার জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। যেখানে মানুষ মানুষের কল্যাণ কামনা করবে, পারলে উপকার করবে, না পারলে অপকার অন্তত করবে না৷ যেই সমাজে রাষ্ট্রপ্রধান ঘোষণা করে দেবেন, “যদি আমার সন্তানও চুরি করে আমি নিজে তার হাত কাটব”! যেমনটা মদিনার জমিনে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন হুজুর রাসূলুল্লাহ ﷺ।

আর সবচাইতে বড় পরিশুদ্ধতা হচ্ছে ইমান আকিদার পরিশুদ্ধতা। ইমান আকিদার পরিশুদ্ধতা ছাড়া সফলতা আসতেই পারে না। নবি করিম ﷺ সর্বপ্রথম আরবের মানুষকে “শিরক” থেকে পবিত্র করেছেন, কারণ শিরক হচ্ছে কুরআন মাজিদের পরিভাষায় “যুলমুন আজিম”বা সবচাইতে বড় জুলুম। প্রিয়নবী ﷺ আল্লাহর একত্ববাদ বা তাওহিদের ধারণাকে সবার আগে পাকাপোক্ত করেছেন। আল্লাহ পাক ও হুজুর ﷺর প্রতি মানুষের ইমান বিশ্বাস ও ভালোবাসাকে পরিশুদ্ধ করেছেন৷ সুখে দুঃখে আমরা যেন আল্লাহ পাকের কাছে ফিরে যাই, আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলের সেই True concept আমাদেরকে শিখিয়েছেন। আল্লাহ পাক আমাদের মালিক, আল্লাহ পাক আমাদের প্রতিপালক, তিনি আমাদের রিজিকদাতা, তিনি আমাদের দুঃখ কষ্ট দূর করার মালিক। এই সকল কনসেপ্ট তিনি সাহাবায়ে কেরামকে শিক্ষা দিয়েছেন।

এই ইমান আকিদাকে ধারণ করে পরিশুদ্ধতার মাধ্যমে যে জাতি যত বেশি আত্মিক উন্নয়ন ঘটিয়েছে সে জাতি তত বেশি উন্নত, সে জাতি তত বেশি সফল।

এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে যে,”ইউরোপ আমেরিকাও তো জাতি হিসেবে বৈষয়িকভাবে আমাদের থেকে অনেক অনেক উন্নত, আবার চারিত্রিক দিকেও আমাদের থেকে তারা বেটার (তারা সাধারণত মিথ্যা কথা বলে না, মানুষের সাথে প্রতারণা করে না, মানুষের উপকারের চেষ্টা করে অপকার করে না, খাদ্যে ভেজাল মেশায় না, তারা ঘুষ দেয় না এবং নেয় না, দুর্নীতি করে না, গীবত করে না, মানুষের উপরে অপবাদ দেয় না, আইন আছে, আছে তার সঠিক প্রয়োগ, আইনের চোখে সবাই সমান, সমাজের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সবার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেছে তারা জনগণের সামনে। তবে তাদের ফরেন পলিসি বা বৈদেশিক নীতি তাদের জনগণ নির্ধারণ করে না। বরং তা করে তাদের মুষ্টিমেয় কজন রাজনীতিবদ এবং ইহুদী জায়োনিস্টরা, এখানে তাদের দেশের সাধারণ জনগণের কোন হাত নেই । এজন্যই তারা আজ এই দেশে এটাক করে, ওই দেশে অশান্তি সৃষ্টি করে। দেশে দেশে যুদ্ধ বাধিয়ে রাখে ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব কাজে তাদের দেশগুলোর বেশিরভাগ মানুষের সমর্থন থাকে না। এজন্যই আমরা সময় সময় যুদ্ধের বিরুদ্ধে তাদের দেশগুলোতেই লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতিবাদ মিছিল হতে দেখি। হ্যাঁ, সাধারণ জনগণকেও মিডিয়া ও পলিটিশিয়ানরা মাঝে মাঝে প্রতারিত করে, প্রভাবিত করে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে উসকে দেয়। ইদানীং ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভীতি বা ইসলামোফোবিয়া সৃষ্টি করার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে সম্মিলিতভাবে ইসরাইলি জায়োনিস্ট শক্তি, পশ্চিমা মিডিয়া এবং পলিটিশিয়ানরা )। তাহলে তারা কী জাতি হিসেবে আমাদের থেকে উত্তম?

এর উত্তরে বলতে হবে, জ্ঞান দুই প্রকার৷ ওহীলব্ধ জ্ঞান (revealed knowledge) এবং অর্জিত জ্ঞান (acquired knowledge)!

ইসলামের কনসেপ্ট হচ্ছে, এই উভয় প্রকারের জ্ঞানকেই যে জাতি সঠিকভাবে আঁকড়ে ধরে নিজেদের মাঝে সঠিকভাবে প্রয়োগ করেছে সে জাতি তত উন্নত। ইউরোপ আমেরিকা শুধুমাত্র দ্বিতীয় প্রকারের জ্ঞান অর্থ্যাৎ অর্জিত জ্ঞানকে আঁকড়ে ধরে প্রভূত উন্নতি পেয়েছে, কিন্তু সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ যে জ্ঞান “ওহীলব্ধ জ্ঞান” সেটাকে সমূলে পরিত্যাগ করেছে। আল্লাহ পাক ও তাঁর হাবিব ﷺর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস ও ভালবাসা ব্যাতিরেকে শুধুমাত্র জাগতিক অর্জিত জ্ঞান দ্বারা লব্ধ উন্নতিও ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত উন্নতি নয়৷ এই উন্নতিও আধ্যাত্মিকতা ও অন্তসাড় শূন্য উন্নতি যা বান্দাকে তার রবের নিকটে নিয়ে যায় না। বরং শুধুমাত্র অর্জিত জ্ঞান দ্বারা লব্ধ এই উন্নতি সৃষ্টিকর্তা ও বান্দার মাঝখানের সম্পর্কটাকেই কেটে দেয়৷

কাজেই আকন্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত, কথায় কথায় মিথ্যা বলা, মানুষকে প্রতারণা করা, খাদ্যে ব্যাপক ভেজাল মেশানো, দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন, গরিব মিসকিনের হক মেরে খাওয়াতে চ্যাম্পিয়ন, মানুষের অপকার ও অকল্যাণ কামনায় চ্যাম্পিয়ন, সূদ ঘুষের অবাধ বন্যাতে বসবাস করে, জানমালের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, মতপ্রকাশের অধিকারহীন সমাজে বসবাস করে আমরা যদি ইটের জঞ্জালের উন্নয়ন দেখেই স্লোগান তুলি যে “আমরা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছি, দেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে, আমরা এই হয়ে যাচ্ছি ওই হয়ে যাচ্ছি”, তবে তা অন্তত কোন মুসলমানের মুখে শোভা পায় না।

ওহীলব্ধ জ্ঞান ও অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে জাতি হিসেবে আমরা যেদিন প্রকৃত অর্থে আত্মীক, চারিত্রিক, নৈতিক ও বৈষয়িক উন্নয়ন ঘটাতে পারব, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিপ্লব ঘটাতে পারব সেদিনই আমরা হব ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত উন্নত জাতি।

(Visited 46 times, 1 visits today)