ফরাসি অর্থনীতিবিদ জঁ তিহল এর মুক্তবাজার গবেষণা

মো: মহসিন, সাব ইডিটর: সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যকার সহজাত দুর্বলতা, অদক্ষতা ও গতানুগতিকতা দূর করার জন্য এগুলোকে ব্যক্তিমালিকানায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সেগুলো যখন একচেটিয়া দানবে পরিণত হয়, তখন ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’র মূলমন্ত্র পরাভূত হয়। এই অজুহাতে সেটিকে ঠেকানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও সক্ষমতা বেশির ভাগ সরকারের থাকে না। আবার কোনো কোনো বড় প্রতিষ্ঠান একচেটিয়া বাণিজ্যিক স্বার্থে জনস্বার্থ বা ভোক্তাস্বার্থের হানি করে। এ-জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে আরও উৎপাদনমুখী ও গ্রাহকবান্ধব করে তোলা যায়, সে বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার গবেষণাকর্মে অবদানের জন্য দেওয়া হয়েছে অর্থনীতিতে ২০১৪ সালে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছিলো জঁ তিহলকে।

৩০ বছর ধরে গবেষণা করে জঁ তিহল দেখিয়েছেন, কীভাবে স্বল্পসংখ্যক বৃহৎ প্রতিষ্ঠান বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভোক্তাদের ক্ষতি করে এবং নির্দেশনা দিয়েছেন সরকার কীভাবে এই প্রবণতা মোকাবিলা করতে পারে। এটি কার্যকর করতে গিয়ে একই ধরনের ও মাত্রার নিয়ন্ত্রণ যদি সব খাতের ওপর প্রয়োগ করা হয়, তা কার্যকর হয় না। তাই প্রতিটি খাতের জন্য প্রযোজ্য নিয়ন্ত্রণের নীতিমালা ভিন্ন হওয়া দরকার। কারণ, এক খাতের জন্য তৈরি নিয়মাচার দিয়ে অন্য খাতকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

নোবেল কমিটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিলো, বহু শিল্পে স্বল্পসংখ্যক বৃহৎ প্রতিষ্ঠান কিংবা একটি একচেটিয়া প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য থাকে। অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় থাকার কারণে এ-জাতীয় বাজার থেকে প্রায়ই সামাজিকভাবে অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। যেমন: উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে বেশি দাম, আরও বেশি উৎপাদনশীল নতুন প্রতিষ্ঠানের বাজারে প্রবেশ ঠেকিয়ে দিয়ে কম অনুপাদনশীল প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা ইত্যাদি।

নোবেল কমিটির মতে, জঁ তিহল এ-জাতীয় বাজার-ব্যর্থতার বিষয়ে গবেষণায় নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছেন। বলা হয়েছে, তাঁর আগে গবেষক ও নীতিনির্ধারকেরা সব শিল্পের জন্য একই সাধারণ নীতিমালা প্রয়োগ করতে চাইতেন, যেমন বিক্রয় মূল্য বেঁধে দেওয়া ইত্যাদি। জঁ তিহল তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, এ রকম নীতিমালা নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ভালো কাজ দিতে পারে, কিন্তু অন্যদের জন্য ভালোর চেয়ে খারাপটা করে বেশি। তাই কানুন কিংবা প্রতিযোগিতার নীতিমালা প্রতিটি শিল্পের উপযোগী করে আলাদাভাবে তৈরি করা উচিত। তিহল টেলিযোগাযোগ থেকে শুরু করে ব্যাংকিং পর্যন্ত বিভিন্ন খাতের জন্য প্রযোজ্য নীতিমালা প্রণয়নের উপযোগী কাঠামো নির্দেশ করেছেন, যাতে সরকার কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বড় ও প্রভাবশালী সব প্রতিষ্ঠানকে তাদের প্রতিযোগী ও ভোক্তাদের ক্ষতি না করে আরও উৎপাদনশীল হওয়ার প্রণোদনা দিতে পারে।

এবারের নোবেল স্মারক পুরস্কারের প্রধান বলেছেন, আমরা সব সময়ই বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বড় ও শক্তিমান প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে সমাজের সর্বোচ্চ স্বার্থে কাজ করে, তার জন্য কী ধরনের আইন ও প্রতিযোগিতার নীতিমালা প্রণয়ন করা যায়। তবে তিহল এ কথারও জবাব দিয়েছেন তাঁর মতো করে। তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এসব বিধান হতে হবে এমন, যাতে উদ্যোক্তা বা উদ্যোগ মরে না যায়।

তাঁর মতে, স্বাভাবিক গতিতে বাজার যাতে চলতে পারে, তার জন্য দরকার একটা শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা। অথচ প্রতিষ্ঠানগুলো খুব বেশি বড় ও প্রভাবশালী হয়ে উঠলে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে প্রায়ই ব্যর্থ হতে হয়। এ-জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণকারী সরকারি সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে এবং আইনের অপব্যবহার করে তাদের প্রতিযোগীদের জন্য বাধা সৃষ্টি করে।

তিহলের এই মন্তব্য আমাদের মতো দেশগুলোর জন্য কতখানি প্রযোজ্য, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ রকম উপসর্গ আরও ভয়াবহ। রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালীদের চাপে প্রতি পদে যেখানে আইনের লঙ্ঘন ঘটে, ব্যাহত হয় সুশাসন, সেখানে তিহলের হিতোপদেশ ও কৌশলপত্র কতখানি কার্যকর হতে পারে? পুরস্কার কমিটির এক সদস্য এই বাস্তবতা স্বীকার করে বলেছেন, রাজনীতিবিদেরা যদি তাঁর উপদেশ না ধরেন, তাহলে তাঁরা হবেন নির্বোধ। তাঁরা কখনোই কথা শোনেন না।

একচেটিয়া ব্যবসা ও বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার বিষয়ে গবেষণার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়েও তিহলের দৃঢ় মনোভাব প্রকাশ পায়। এটি উদ্ভূত হয়েছে আমেরিকার সাব-প্রাইম সংকট থেকে শুরু হওয়া আর্থিক খাতের বিপর্যয়ের ঘটনা থেকে। ২০০৭ সালে আমেরিকার আর্থিক বাজারের এই বিপর্যয় সারা বিশ্বকে আলোড়িত করেছিল। আজ আর কারও অজানা নেই যে সেই সময়কার শিথিল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কিংবা অপর্যাপ্ত নজরদারিই এই সংকটের জন্য দায়ী। সেই বিপর্যয়ের ওপর তিহল আরও দুই অর্থনীতিবিদ, বেলজিয়ামের মাথিয়াস দেভাত্রিপন্ত এবং ফ্রান্সের জাঁ শার্ল রশের সঙ্গে মিলিতভাবে লেখেন ব্যালান্সিং দ্য ব্যাংকস: গ্লোবাল লেসনস ফ্রম দ্য ফিনানশিয়াল ক্রাইসিস (২০১০) শিরোনামের একটি বই। সেবারের সংকটের আবর্তে পড়ে বহু ব্যাংক ধসে পড়ার উপক্রম হলে সরকারিভাবে সেগুলো উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হয়। আর্থিক খাতের এই বিপর্যয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে ভবিষ্যতে সংকটে পড়া ব্যাংকগুলো কীভাবে পরিচালনা করতে হবে, বর্তমান বিশ্বের বৃহৎ, পরস্পরযুক্ত ও জটিল ব্যাংকিং-ব্যবস্থায় আরও দক্ষতা ও স্বল্প ঝুঁকি নিশ্চিত করা যায়, সেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বইটিতে।

গ্রন্থকারেরা মনে করেন, আর্থিক বাজারে উদ্ভাবিত ব্যাংকিং-সেবার সম্পূরক ও পরিপূরক বিভিন্ন সেবার কারণে কিছু কিছু নিয়ন্ত্রণমান শিথিল করা হয়েছে। কারণ, অন্য সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নজরদারি ব্যাংকগুলোর তুলনায় অপেক্ষাকৃত শিথিল। তিহল ও তাঁর সহযোগীরা সমালোচনার সুরে উল্লেখ করেন, এমনকি বাসেল–২-তে মূলধন-পর্যাপ্ততার মাপকাঠিও নামানো যাবে, যদি ব্যাংকগুলো দেখাতে পারে তাদের ঝুঁকির হার সীমিত। উদাহরণ হিসেবে দেখানো যায় ঋণঝুঁকি নিরূপণে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট রেটিং উন্নত হলে সেই ঋণের বিপরীতে মূলধন-পর্যাপ্ততার হার কমিয়ে রাখা সম্ভব। অর্থাৎ, একটা রেটিং এজেন্সির মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করবে ব্যাংকের ঋণঝুঁকির বিপরীতে সংরক্ষিত মূলধনের পরিমাণ। গ্রন্থকারেরা এর বিপদ সম্পর্কে খোলাখুলি না বললেও এ কথা অনস্বীকার্য যে মূলধন সংরক্ষণের কিছু ক্ষেত্রে রেটিং এজেন্সির ওপর পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার মধ্যেও ঝুঁকি আছে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন গজিয়ে ওঠা অনেক রেটিং এজেন্সির হাতে দুর্বল হিসাবরক্ষণকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রেটিং কতখানি নির্ভরযোগ্য হবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
গ্রন্থকারত্রয় আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে বাসেল–২ সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের পর ঝুঁকি মূল্যায়নের কাজটি ব্যাংকগুলো নিজেরাই করবে ইন্টারনাল রিস্ক বেজড মডেল(আইআরবি)। অর্থাৎ একপর্যায়ে স্বাধীন কোনো তৃতীয় পক্ষের করণীয় কাজটি ব্যাংক নিজেরাই সমাধা করার সুযোগ পাবে। তিহলদের আশঙ্কা, এসব ঝুঁকি মূল্যায়ন মডেলের নানাবিধ জটিলতার কারণে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের পক্ষে সেসবের পূর্ণ নিরীক্ষা দুরূহ হয়ে পড়বে, যদিও সেসব মডেলের বিভিন্ন উপাদান ও নিয়ামক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমেই নির্ধারিত হবে। লেখকত্রয়ের এই আশঙ্কার আলোকে আমাদের দেশের বাস্তবতায় ব্যাংকগুলোর হাতে নিজ নিজ ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষমতা অর্পণ করলে তার অপব্যবহার হবে কি না, সেটি ভেবে দেখতে হবে। কারণ, আমাদের দেশে এই স্বচ্ছতা ও পেশাগত সততার সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি। যদিও ২০১৫ সালের মধ্যে আইআরবি মডেল বাস্তবায়নের কর্মসূচি রয়েছে, কিন্তু এ ব্যাপারে আমাদের যথাযথ প্রস্তুতি ও যোগ্যতা নেই। ফলে এটি আদৌ বাস্তবায়ন করা উচিত কি না ভেবে দেখা উচিত।

তিহল ব্লুমবার্গ টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যেসব ব্যাংক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় উদ্ধার পায়, তাদের জন্য কঠোরতর আইন হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেছেন, করদাতা নাগরিকদের টাকায় ব্যাংকগুলো যাতে ফাটকাবাজি না করতে পারে, তা ঠেকানোর জন্য কড়া আইন থাকা দরকার। যদি তাদের উদ্ধার করতে হয়, তাহলে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও রাখতে হবে। আমাদের দেশের বেসিক ব্যাংককেও বিসিসিআই পতনের পর সরকারিভাবে উদ্ধার করা হয়েছিল। অথচ সেই ব্যাংকের সাম্প্রতিক কেলেঙ্কারি তিহলের এই মতের পক্ষে জোরালো সাক্ষ্য দেয়, যথাযথ আইন থাকলেও এই ব্যাংকের জন্য সেসবের কিছুই যেন প্রযোজ্য ছিল না। এই মারাত্মক ব্যত্যয়ের কারণও আমরা জানি: রাজনৈতিক প্রভাব। রাষ্ট্রীয়, তথা রাজনৈতিক প্রভাবের কথাও তিহল তুলে এনেছেন, যা রোধ করার জন্য দেওয়া তাঁর কৌশলপত্রের স্বীকৃতি দিয়েছে নোবেল কমিটি।
বছর দুই আগে আমেরিকায় ‘ওয়াল স্ট্রিট দখল করো’ আন্দোলনের বিক্ষোভকারীদের দাবি ছিল উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কবিহীন মুদ্রা ও শেয়ার ব্যবসাসম্পর্কিত আইনগুলো বাস্তবায়ন করা। স্পষ্টতই এসব দাবির মূল প্রতিপাদ্য ছিল অর্থনৈতিক বৈষম্য ও পুঁজিবাদী শোষণ, সম্পদের পুঞ্জীভবন ও সরকার এবং তার আইনের ওপর বৃহৎ করপোরেটদের অন্যায় প্রভাবের বিরুদ্ধে। এটি তিহলেরও গবেষণার বিষয়। ব্যবসায় একচেটিয়াতন্ত্র সম্পর্কে তিহলের মতবাদ আমাদের আরও একবার স্মরণ করিয়ে দেয় লেনিনের ধারণার কথা, যখন মুক্তবাজার পরিণত হতে পারে একচেটিয়া পুঁজিবাদে। এই পর্যায়ে রাষ্ট্রই একচেটিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে। লেনিন দেখিয়েছেন, কীভাবে দৈত্যাকার প্রতিষ্ঠানগুলো কার্টেল ও সিন্ডিকেট গঠন করে বিভিন্ন বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে। তিহলও এ রকম কার্টেল ও একচেটিয়াবাদের বিপদ সম্পর্কে সরকার ও নিয়ন্ত্রকদের সতর্ক করেছেন।

আমরা ঠিক জানি না তিহল নিয়ন্ত্রণবাদী, নাকি নিয়ন্ত্রণবিরোধী মুক্তবাজারের সমর্থক। কিন্তু তাঁর মতবাদের মধ্যে নিয়ন্ত্রণকে সমর্থন ও একচেটিয়াতন্ত্রের বিরোধিতার মনোভাব প্রতিফলিত।

(Visited 17 times, 1 visits today)