ভাস্কর্য নির্মাণ: ইসলামী দৃষ্টিকোণ

ড. এ. এস. এম. ইউসুফ জিলানী: ইদানিং ভাস্কর্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। কেউ এটাকে হারাম আবার কেউ বৈধ বলছে। অনেকে এ বিষয়ে জানতে চেয়েছেন তাই আমি ইসলামের দৃষ্টিতে ভাস্কর্য নির্মাণের বিধান সম্পর্কে কিছু আলোচনা পেশ করছি।

সংজ্ঞা: ছবি, প্রতিকৃতি ও ভাস্কর্য বোঝাতে আরবিতে তিনটি শব্দ ব্যবহৃত হয়: (صورة)সুরাহ (تصوير)তাসবির ও (تمثال)তিমসাল। আধুনিক অভিধানসমূহে সুরাহ (صورة) ও (تصوير)তাসবিরকে সমার্থবোধক শব্দ হিসেবে গণ্য করা হলেও তিমসালকে ভিন্নার্থে প্রয়োগ করা হয়েছে। আধুনিক অভিধান মতে ((صورة সুরাহ ও ((تصوير তাসবির এর অর্থ: ছবি, আকৃতি, চিত্র, অনুলিপি, প্রতিকৃতি ইত্যাদি। আর তিমসাল হলো মুর্তি ভাস্কর্য প্রতিমা ইত্যাদি। অর্থাৎ আধুনিক পরিভাষায় কাগজ, কাপড় বা অন্য কোন বস্তুর উপর (জলরং তেলরং বা অন্য কোন মাধ্যমে) অঙ্কিত ছবিকে ((صورة সুরাহ বা ((تصوير তাসবির বলা হচ্ছে, যার দৈর্ঘ ও প্রস্থ আছে কিন্তু উচ্চতা নেই। পক্ষান্তরে কাঠ, পাথর বা অন্য কোন বস্তু দ্বারা নির্মিত ভাস্কয তথা স্বতন্ত্র শিল্পকর্মকে (تمثال)তিমসাল হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে যার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা আছে।

তবে হাদিস ও প্রাচীন অভিধানে শব্দত্রয়কে সমার্থবোধক শব্দ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন যে ঘরে কুকুর বা ছবি থাকে সে ঘরে ফেরেস্তা প্রবেশ করে না। এমন অর্থবোধক হাদিসটির বিভিন্ন রেওয়ায়েতে আমরা উপর্যুক্ত শব্দত্রয়ের একটির স্থলে অপরটির প্রয়োগ দেখতে পাই।

لا تدخل الملائكة بيتا فيه كلب ولا صورة যে ঘরে কুকুর বা ছবি থাকে সে ঘরে ফেরেস্তা প্রবেশ করে না। বুখারি, ২: ৩৩৮
لا تدخل الملائكة بيتا فيه كلب ولا تصاويرযে ঘরে কুকুর বা ছবি থাকে সে ঘরে ফেরেস্তা প্রবেশ করে না। বুখারি, ৩: ২০৪
لا تدخل الملائكة بيتا فيه كلب ولا تماثيلযে ঘরে কুকুর বা ছবি থাকে সে ঘরে ফেরেস্তা প্রবেশ করে না। মুসলিম, ৩: ৫৩১
বিখ্যাত অভিধান প্রণেতা ইবনু মানযুর (মৃ. ১৩১১ খৃ.) এর মতে, (تمثال)তমিসালও ((صورة সুরাহ সমার্থবোধক। অর্থাৎ ছবি, প্রতিকৃতি, চিত্র বা ভাস্কর্য সবকিছু উপর্যুক্ত শব্দত্রয়ের দ্যোতনার অধীন। হাদিস ও তাফসির গ্রন্থেও এ মতের সমর্থন পাওয়া যায়।
ইমাম কুরতুবি বলেন,
التمثال: كل ما صور علي مثل صورة من حيوان وغير حيوان-
কোন প্রাণীর বা অপ্রাণীর আকৃতির অনুরূপ যা কিছু অঙ্কন করা হয় তাকে التمثال বলে।
ভাষাবিজ্ঞানী ও তাফসীরকার আল্লামা যামাখশারী বলেন-
التمثال: كل ما صور علي مثل صورة من حيوان وغير حيوان-
কোন প্রাণীর বা অপ্রাণীর আকৃতির অনুরূপ যা কিছু অঙ্কন করা হয় তাকে التمثال বলে। [আল কাশশাফ, 13: 24]

সহীহ আল-বুখারীর বিখ্যাত ভাষ্যকার হাফিজ ইবনু হাজর আসকালানী আরো পরিষ্কার ভাষায় সংজ্ঞাটি উল্লেখ করেছেন:
وهو الشي المصور أعم من أن يكون شاخصا أو يكون نقشا أو دهنا أو نسجا في ثوب-
অঙ্কিত বস্তুকে বলে তা কায়াবিশিষ্ট হোক, নকশা হোক, তেলরং বা কাপড়ের বুননের মাধ্যমেই হোক। [ফতহুল বারি, ১০: ৪৪০।]
মোটকথা, হাদীস ও প্রাচীন অভিধানসমূহের প্রচলন অনুসারে বলা যায় যে, ছবি, চিত্র, প্রতিকৃতি বা ভাস্কর্য বোঝাতে সাধারণভাবে উপরের তিনটি শব্দ (تمثال)তিমসালও (صورة) সুরাহ (تصوير) তাসবির ব্যবহৃত হয়। তবে কোন একটি অর্থের জন্য নির্দিষ্ট করতে হলে বিশেষণ যোগ করতে হয় যেমন ভাস্কর্য বোঝাতে কায়াদার ছবি, মূর্ত ছবি, এমন ছবি যার নিজস্ব ছায়া নেই ব্যবহৃত হয়। ভাস্কর্য ও চিত্রের পরিধি পরিস্কার করে বোঝানোর জন্য কিছু বিস্তারিত আলোচনা করা হচ্ছে।

ভাস্কর্য: প্রতিকৃতি, প্রতিমা, পুতুল বা খেলার পুতুল; মাটি, বালি, কাঁদা, খড়-কুটো, পাথর, লোহা, তামা, পিতল, সোনা, রূপা, ব্রোঞ্জ বা অনুরূপ কোন বস্তু দ্বারা তৈরি মানুষ বা জীবের (ছায়াদার) পূর্ণাঙ্গ বা তার কোন অংশের প্রতিরূপ। [যার দৈর্ঘ, প্রস্থ ও উচ্চতা রয়েছে অর্থাৎ থ্রি ডাইমেনশানাল ছবি। আরবিতে
صورة مجسمة أو صورة شاخصة أو صورة لها ظل-
ছবি: নানাবিধ রঙের (তেলরং, জলরং ইত্যাদি) সাহায্যে তুলি দিয়ে হাতে আঁকা বা বøক দ্বারা মুদ্রিত প্রতিরূপ [যারা দৈর্ঘ ও প্রস্থ আছে কিন্তু উচ্চতা নেই অর্থাৎ টু ডাইমেনশলান ছবি আরবিতে-
صورة غير مجسمة أو صورة غير شاخصة أو صورة ليس لها ظل-
চিত্রাঙ্কন ও ভাস্কর্য প্রসঙ্গে আল কুরআন
صورة ও (تصوير) ক্রিয়ামূল হতে উদ্ভূত ক্রিয়াপদ আল-কুরআনের ৫ টি স্থানে এসেছে। (৩:৬), (৭: ১১), (৪০: ৬৪), (৬৪:৩), (৮২: ৮), (৫৯: ২৪) প্রতিটি আয়অতে তাসবির তথা আকৃতি নির্ধারণের বিষয়টিকে আল্লাহ তায়ালার সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে মানুষের আকৃতি নির্ধারণ এবং তার শারীরিক কাঠামোর রূপদান কেবল আল্লাহরই কাজ।

تمثال শব্দটি আল কুরআনের দুই জায়গায় এসেছে। প্রথম স্থানে শব্দটির অর্থ হলো মুর্তি। আর দ্বিতীয় স্থানে ফুল-পাতা ও নানা প্রাকৃতিক দৃশ্য বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
ما هذه التماثيل التي أنتم لها عاكفون قالوا وجدنا أبائنا لها عابدين-
এ মুর্তিগুলো কি যে এদের ইবাদতে মশগুল? তারা বললো: আমাদের বাপদাদাদেরকে এদের ইবাদতকারী হিসেবে পেয়েছি। [আল কুরআন,২১: ৫২-৫৩]
يعلمون له ما يشاء من محارب وثماثيل وجفان كالجواب وقدور راسيات. اعملوا ال داود شكرا. وقليل من عبادي الشكور-
তারা তার জন্য তাই বানাত যা সে চাইত; বিভিন্ন দৃশ্য, বড় বড় পুকুরের মত থালা এবং নিজ স্থানে প্রতিষ্ঠিত বড় বড় ডেগসমূহ। হে দাউদ বংশধর! কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। আর আমার বান্দাদের মধ্যে অল্প সংখ্যকই শোকরগুজার। [আল কুরআন, ৩৪: ১৩]
ভাস্কর্য নির্মাণ ইসলামে জায়েয নয়:
কোনো প্রাণীর-মূর্তি নির্মাণ করা ইসলামী শরীয়তে কঠিন কবীরা গুনাহ ও হারাম । মূর্তি সংগ্রহ, মূর্তি সংরক্ষণ এবং মূর্তির বেচাকেনা ইত্যাদি সকল বিষয় কঠিনভাবে নিষিদ্ধ। মূর্তিপূজার কথা তো বলাই বাহুল্য, মূর্তি নির্মাণেরও কিছু কিছু পর্যায় এমন রয়েছে যা কুফরী।

কেউ কেউ মূর্তি ও ভাস্কর্যের মধ্যে বিধানগত পার্থক্য দেখাতে চান। এটা চরম ভুল। ইসলামের দৃষ্টিতে মূর্তি ও ভাস্কর্য দুটোই পরিত্যাজ্য। কুরআন মজীদ ও হাদীস শরীফে এ প্রসঙ্গে যে শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলো মূর্তি ও ভাস্কর্য দুটোকেই নির্দেশ করে। এ প্রসঙ্গে কুরআন মজীদের স্পষ্ট নির্দেশ-
فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْاَوْثَانِ وَ اجْتَنِبُوْا قَوْلَ الزُّوْرِۙ۝۳۰
‘তোমরা পরিহার কর অপবিত্র বস্ত্ত অর্থাৎ মূর্তিসমূহ এবং পরিহার কর মিথ্যাকথন।’ -সূরা হজ্জ : ৩০
এই আয়াতে পরিস্কারভাবে সবধরনের মূর্তি পরিত্যাগ করার এবং মূর্তিকেন্দ্রিক সকল কর্মকান্ড বর্জন করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।

আরো লক্ষণীয় বিষয় এই যে. উপরের আয়াতে সকল ধরনের মূর্তিকে ‘রিজস’ শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘রিজ্স’ অর্থ নোংরা ও অপবিত্র বস্ত্ত। বোঝা যাচ্ছে যে, মূর্তির সংশ্রব পরিহার করা পরিচ্ছন্ন ও পরিশীলিত রুচিবোধের পরিচায়ক।

দ্বিতীয় আয়াত:
অন্য আয়াতে কাফের সম্প্রদায়ের অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে এভাবে-
وَ قَالُوْا لَا تَذَرُنَّ اٰلِهَتَكُمْ وَ لَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَّ لَا سُوَاعًا ۙ۬ وَّ لَا یَغُوْثَ وَ یَعُوْقَ وَ نَسْرًاۚ۝۲۳
‘এবং তারা বলেছিল, তোমরা কখনো পরিত্যাগ করো না তোমাদের উপাস্যদেরকে এবং কখনো পরিত্যাগ করো না ওয়াদ্দ, সুওয়া, ইয়াগূছ, ইয়াঊক ও নাসরকে।’ -সূরা নূহ : ২৩

এখানে কাফের সম্প্রদায়ের দুটো বৈশিষ্ট্য উল্লেখিত হয়েছে : ১. মিথ্যা উপাস্যদের পরিত্যাগ না করা। ২. মূর্তি ও ভাস্কর্য পরিহার না করা। তাহলে মিথ্যা উপাস্যের উপাসনার মতো ভাস্কর্যপ্রীতিও কুরআন মজীদে কাফেরদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত। অতএব এটা যে ইসলামে গর্হিত ও পরিত্যাজ্য তা তো বলাই বাহুল্য।

উপরের আয়াতে উল্লেখিত মূর্তিগুলো সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, এগুলো হচ্ছে নূহ আ.-এর সম্প্রদায়ের কিছু পুণ্যবান লোকের নাম। তারা যখন মৃত্যুবরণ করেছে তখন শয়তান তাদের সম্প্রদায়কে এই কুমন্ত্রনা দিয়েছে যে, তাদের স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলোতে মূর্তি স্থাপন করা হোক এবং তাদের নামে সেগুলোকে নামকরণ করা হোক। লোকেরা এমনই করল। ওই প্রজন্ম যদিও এই সব মূর্তির পূজা করেনি কিন্তু ধীরে ধীরে প্রকৃত বিষয় অস্পষ্ট হয়ে গেল এবং পরবর্তী প্রজন্ম তাদের পূজায় লিপ্ত হল। -সহীহ বুখারী হাদীস : ৪৯২০

তৃতীয় আয়াত:
কুরআন মজীদে মূর্তি ও ভাস্কর্যকে পথভ্রষ্টতার কারণ হিসেবে চিহ্ণিত করা হয়েছে। এক আয়াতে এসেছে-
رَبِّ اِنَّهُنَّ اَضْلَلْنَ كَثِیْرًا مِّنَ النَّاسِ ۚ
‘ইয়া রব, এরা (মূর্তি ও ভাস্কর্য) অসংখ্য মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছে!’ -সূরা ইবরাহীম : ৩৬
অন্য আয়াতে এসেছে-
وَ قَالُوْا لَا تَذَرُنَّ اٰلِهَتَكُمْ وَ لَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَّ لَا سُوَاعًا ۙ۬ وَّ لَا یَغُوْثَ وَ یَعُوْقَ وَ نَسْرًاۚ۝۲۳ وَ قَدْ اَضَلُّوْا كَثِیْرًا ۚ۬
‘আর তারা বলেছিল, তোমরা পরিত্যাগ করো না তোমাদের উপাস্যদের এবং পরিত্যাগ করো না ওয়াদ্দ সুওয়াকে, ইয়াগূছ, ইয়াঊক ও নাসরকে। অথচ এগুলো অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে।’ -সূরা নূহ : ২৩-২৪
কুরআন মজীদে একটি বস্ত্তকে ভ্রষ্টতার কারণ হিসেবে চিহ্ণিত করা হবে এরপর ইসলামী শরীয়তে তা বৈধ ও গ্রহণযোগ্য থাকবে-এর চেয়ে হাস্যকর কথা আর কী হতে পারে।

চতুর্থ আয়াত:
কুরআনের ভাষায় মূর্তি ও ভাস্কর্য হল বহুবিধ মিথ্যার উৎস। ইরশাদ হয়েছে-
اِنَّمَا تَعْبُدُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ اَوْثَانًا وَّ تَخْلُقُوْنَ اِفْكًا ؕ
তোমরা তো আল্লাহর পরিবর্তে উপাসনা কর (অসার) মূর্তির এবং তোমরা নির্মাণ কর ‘মিথ্যা’। -সূরা আনকাবুত : ১৭
মূর্তি ও ভাস্কর্য যেহেতু অসংখ্য মিথ্যার উদ্ভব ও বিকাশের উৎস তাই উপরের আয়াতে একে ‘মিথ্যা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই আয়াতগুলো থেকে পরিষ্কার জানা যাচ্ছে যে, মূর্তি ও ভাস্কর্য দুটোই সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য। হাদীস শরীফেও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূর্তি ও ভাস্কর্য সম্পর্কে পরিষ্কার বিধান দান করেছেন।
১. হযরত আমর ইবনে আবাসা রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন ‘আল্লাহ তাআলা আমাকে প্রেরণ করেছেন আত্মীয়তার সর্ম্পক বজায় রাখার, মূর্তিসমূহ ভেঙ্গে ফেলার, এবং এক আল্লাহর ইবাদত করার ও তাঁর সঙ্গে অন্য কোনো কিছুকে শরীক না করার বিধান দিয়ে। -সহীহ মুসলিম হা. ৮৩২

২. আবুল হাইয়াজ আসাদী বলেন, আলী ইবনে আবী তালেব রা. আমাকে বললেন, ‘আমি কি তোমাকে ওই কাজের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করব না, যে কাজের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে প্রেরণ করেছিলেন? তা এই যে, তুমি সকল প্রাণীর মূর্তি বিলুপ্ত করবে এবং সকল সমাধি-সৌধ ভূমিসাৎ করে দিবে।’ অন্য বর্ণনায় এসেছে,… এবং সকল চিত্র মুছে ফেলবে।’ -সহীহ মুসলিম হা. ৯৬৯

৩. আলী ইবনে আবী তালেব রা. বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি জানাযায় উপস্থিত ছিলেন। তখন তিনি বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে কে আছে, যে মদীনায় যাবে এবং যেখানেই কোনো প্রাণীর মূর্তি পাবে তা ভেঙ্গে ফেলবে, যেখানেই কোনো সমাধি-সৌধ পাবে তা ভূমিসাৎ করে দিবে এবং যেখানেই কোনো চিত্র পাবে তা মুছে দিবে?’ আলী রা. এই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্ত্তত হলেন। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে কেউ পুনরায় উপরোক্ত কোনো কিছু তৈরী করতে প্রবৃত্ত হবে সে মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি নাযিলকৃত দ্বীনকে অস্বীকারকারী।’ -মুসনাদে আহমাদ হা. ৬৫৭

এই হাদীসগুলো থেকে স্পষ্ট জানা যাচ্ছে যে, যে কোনো প্রাণী মূর্তিই ইসলামে পরিত্যাজ্য এবং তা বিলুপ্ত করাই হল ইসলামের বিধান। আর এগুলো নির্মাণ করা ইসলামকে অস্বীকারকারী সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্য।
৪. আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
إِنَّ مِنْ أَشَدِّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُوْنَ.
প্রতিকৃতি তৈরিকারী (ভাস্কর, চিত্রকর) শ্রেণী হল ওইসব লোকদের অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে কিয়ামত-দিবসে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি প্রদান করা হবে।’ -সহীহ বুখারী হা. ৫৯৫০
৫. আবু হুরায়রা রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّ أَصْحَابَ هَذِهِ الصُّوَرِ يُعَذَّبُوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَيُقَالُ لَهُمْ : أَحْيُوْا مَا خَلَقْتُمْ.
ওই লোকের চেয়ে বড় জালেম আর কে যে আমার সৃষ্টির মতো সৃষ্টি করার ইচ্ছা করে। তাদের যদি সামর্থ্য থাকে তবে তারা সৃজন করুক একটি কণা এবং একটি শষ্য কিংবা একটি যব! -সহীহ বুখারী হা. ৫৯৫৩

এই হাদীসটি বর্তমান সময়ের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, যখন ভাস্কর-চিত্রকর, এমনকি গল্পকার ও ঔপন্যাসিকদেরকে পর্যন্ত ‘স্রষ্টা’ বলতে এবং তাদের কর্মকান্ডকে ‘সৃষ্টি’ বলতে সামান্যতমও দ্বিধাবোধ করা হয় না। কোনো কোনো আলোচকের আলোচনা থেকে এতটা ঔদ্ধত্যও প্রকাশিত হয় যে, যেন তারা সত্যি সত্যিই স্রষ্টার আসনে আসীন হয়ে গিয়েছেন!
সহীহ বুখারীর বিখ্যাত ভাষ্যকার হাফেয ইবনে হাজার আসকানী রাহ. লেখেন- এই ভাস্কর ও চিত্রকর সর্বাবস্থাতেই হারাম কাজের মধ্যে লিপ্ত। আর যে এমন কিছু নির্মাণ করে যার পূজা করা হয় তার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। আর যে স্রষ্টার সামঞ্জস্য গ্রহণের মানসিকতা পোষণ করে সে কাফের ।’ -ফতহুল বারী ১০/৩৯৭

৬. উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. ও আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذَهَبَ يَخْلُقُ خَلْقًا كَخَلْقِيْ؟ فَلْيَخْلُقُوْا ذَرَّةً وَلْيَخْلُقُوْا حَبَّةً أَوْ لِيَخْلُقُوْا شَعِيْرَةً.
এই প্রতিকৃতি নির্মাতাদের (ভাস্কর, চিত্রকরদের) কিয়ামত-দিবসে আযাবে নিক্ষেপ করা হবে এবং তাদেরকে সম্বোধন করে বলা হবে, যা তোমরা ‘সৃষ্টি’ করেছিলে তাতে প্রাণসঞ্চার কর!’
-সহীহ বুখারী হা. ৭৫৫৭, ৭৫৫৮;

৭. আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘যে কেউ দুনিয়াতে কোনো প্রতিকৃতি তৈরি করে কিয়ামত-দিবসে তাকে আদেশ করা হবে সে যেন তাতে প্রাণসঞ্চার করে অথচ সে তা করতে সক্ষম হবে না।’ -সহীহ বুখারী হা. ৫৯৬৩

৮. আউন ইবনে আবু জুহাইফা তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুদ ভক্ষণকারী ও সুদ প্রদানকারী, উল্কি অঙ্কণকারী ও উল্কি গ্রহণকারী এবং প্রতিকৃতি প্রস্ত্ততকারীদের (ভাস্কর, চিত্রকরদের) উপর লানত করেছেন। -সহীহ বুখারী হা. ৫৯৬২
এই হাদীসগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে,ভাস্কর্য নির্মাণ অত্যন্ত কঠিন কবীরা গুনাহ। আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা কুফরীরও পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
মূর্তি ও ভাস্কর্যের বেচাকেনাও হাদীস শরীফে সম্পূর্ণ হারাম সাব্যস্ত করা হয়েছে।

৯. হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের সময় মক্কায় থাকা অবস্থায় এই ঘোষণা দিয়েছেন যে, আল্লাহ ও তার রাসূল মদ ও মূর্তি এবং শুকর ও মৃত প্রাণী বিক্রি করা হারাম করেছেন।’ -সহীহ বুখারী হা. ২২৩৬

১০. উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসুস্থতার সময় তাঁর জনৈকা স্ত্রী একটি গির্জার কথা উল্লেখ করলেন। গির্জাটির নাম ছিল মারিয়া। উম্মে সালামা ও উম্মে হাবীবা ইতোপূর্বে হাবাশায় গিয়েছিলেন। তারা গির্জাটির কারুকাজ ও তাতে বিদ্যমান প্রতিকৃতিসমূহের কথা আলোচনা করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শয্যা থেকে মাথা তুলে বললেন, ওই জাতির কোনো পুণ্যবান লোক যখন মারা যেত তখন তারা তার কবরের উপর ইবাদতখানা নির্মাণ করত এবং তাতে প্রতিকৃতি স্থাপন করত। এরা হচ্ছে আল্লাহর নিকৃষ্টতম সৃষ্টি।’-সহীহ বুখারী হা. ১৩৪১ সহীহ মুসলিম হা. ৫২৮ নাসায়ী হা. ৭০৪

১১. আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, ‘(ফতহে মক্কার সময়) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বায়তুল্লাহয় বিভিন্ন প্রতিকৃতি দেখলেন তখন তা মুছে ফেলার আদেশ দিলেন। প্রতিকৃতিগুলো মুছে ফেলার আগ পর্যন্ত তিনি তাতে প্রবেশ করেননি।’ -সহীহ বুখারী হা. ৩৩৫২
দৃষ্টান্তস্বরূপ এগারোটি হাদীস পেশ করা হল। আলোচিত প্রসঙ্গে ইসলামী বিধান বোঝার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। কুরআন মজীদে যে কোনো ধরনের মূর্তির সংশ্রব ও সংশ্লিষ্টতা পরিহারের যে আদেশ মুমিনদেরকে করা হয়েছে সে সম্পর্কে একটা বিস্তারিত ধারণাও উপরোক্ত হাদীসগুলো থেকে জানা গেল।
কুরআন ও সুন্নাহর এই সুস্পষ্ট বিধানের কারণে মূর্তি বা ভাস্কর্য নির্মাণ, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ইত্যাদি সকল বিষয়ের অবৈধতার উপর গোটা মুসলিম উম্মাহর ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

দেখুন : উমদাতুল কারী ১০/৩০৯; ফাতহুল বারী ১০/৪০১; তাকমিলা ফাতহুল মুলহিম : ৪/১৫৯

লেখক: ড. এ. এস. এম. ইউসুফ জিলানী, ঢাকা।

(Visited 136 times, 1 visits today)