শিরোনাম :
মেহেরুননেছা ফয়েজ উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সদস্য (শিক্ষক প্রতিনিধি) নির্বাচিত হলেন চট্টগ্রাম ট্রিবিউন নির্বাহী সম্পাদক মহিউদ্দিন ওসমানী মিরসরাই উপজেলা,বারইয়ারহাট ও মিরসরাই পৌরসভা বিএনপি’র প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত সাতকানিয়ায় প্রবাসী যুবলীগ নেতা তৈয়বের বাড়িতে হামলাকারী সন্ত্রাসীদের বিচারের দাবিতে মক্কা যুবলীগের প্রতিবাদ সভা মীরসরাইয়ের ১৬ ইউপি চেয়ারম্যান শপথ নিলেন আজ ইশতেহার, উন্নয়ন দর্শন ও জনঘনিষ্ট কর্মসূচিই হোক নির্বাচনী কৌশল ৩য় বার আবুতোরাব স্কুলের সভাপতি হলেন আবুল হোসেন বাবুল ওলিয়ে কামেল গোলাম রহমান(রহ.) ও কিছু কথা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কর্তৃক চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ১০ দিনব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মেলার উদ্বোধন কবিতাঃ ‘বই’ মোবারক উদ্দিন সিয়াম সরওয়ার উল্যাহ ফাউন্ডেশন ও লায়ন্স ইম্পেরিয়াল সিটির ফেনীতে চিকিৎসা সেবা প্রদান

ইশতেহার, উন্নয়ন দর্শন ও জনঘনিষ্ট কর্মসূচিই হোক নির্বাচনী কৌশল

অধ্যক্ষ এম ইব্রাহীম আখতারী: গণতান্ত্রিক সমাজের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে নির্বাচন। নির্বাচনের মধ্য দিয়েই জনমতের প্রতিফলন ঘটে। নির্বাচন এর মাধ্যমেই যে কোন দল বা সংগঠন তার শক্তি সামর্থ্যের জানান দেয়। ক্ষমতার সিড়ি মাড়াতে নির্বাচনের অপরিহার্যতা কোনভাবেই এড়ানো যায় না। অথচ নির্বাচন এর মত এহেন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেকটা আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়েছে।
নির্বাচনে ব্যালট বাক্স ছিনতাই, অনৈতিক পেশীশক্তির চর্চা, কেন্দ্র দখল, ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার, ভোটকেন্দ্রে ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে ভীতির সঞ্চার করা, কালো টাকার অবাধ ব্যবহারসহ ইত্যাকার নানাবিধ কারণে গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা-ই আজ সংকটাপন্ন। ফলে নির্বাচনী আমেজ-আবহ, ভাবগাম্ভীর্যতা ও উৎসবমুখরতা ক্রমশঃ বিলুপ্তির দিকে। উপরন্তু এক্ষেত্রে প্রতিনিয়তই তৈরী হচ্ছে জনগণের আস্থার সংকট। এমনকি যার নেতিবাচক পরিণতিতে ক্রমাগত ভোটকেন্দ্র বিমুখ হয়ে পড়ছে ভোটাররা। যা ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেতই বলা যায়।

অনস্বীকার্য বাস্তবতা হলো, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার অন্যতম রীতি ও কৌশল হচ্ছে রাজনৈতিক দলের ইশতেহার, উন্নয়ন দর্শন ও কর্মসূচি। যে ভিত্তির উপর ভর করে জনমতের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। সুতরাং এক্ষেত্রে যদি কোনরূপ ব্যত্যয় ঘটে কিংবা নিরুপদ্রব জনরায়ের প্রতিফলনে বিঘ্নতার সৃষ্টি হয়, তবেই অনিবার্যভাবে জন্ম নেয় ফ্যাসিবাদ। সৃষ্টি হয় হানাহানি-মারামারি। ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পায় সন্ত্রাস-নৈরাজ্য। বিনষ্ট হয় রাজনৈতিক সুস্থতা ও স্থিতিশীলতা। জনজীবনে বিরাজ করে ক্ষোভ-অশান্তি। সর্বোপরি দেশ ও জাতি নিপতিত হয় ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার দিকে। যাইহোক, স্বাধীনতা পরবর্তীতে এদেশে যতগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তন্মধ্যে প্রায় সবগুলো নির্বাচনে জটিলতা লেগেই ছিল। এমন কোন নির্বাচনই বাদ যাবেনা যেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠে নি। যেসবের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ৭মার্চ। এ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ ২৯৩ আসনে জয়লাভ করে। এ নির্বাচনে ১৮টি নির্বাচনী এলাকায় হেলিকপ্টার দিয়ে ব্যালট বাক্স ঢাকায় নিয়ে গিয়ে আওয়ামীলীগ প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষনা করা হয়েছে মর্মে জাসদ কর্তৃক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। ২য় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারী। এ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে। যেটিকে অপরাপর রাজনৈতিক দলসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছিল। ৩য় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৬ সালের ৭মে। এ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি ১৫৩টি আসন নিয়ে জয়লাভ করে। দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি উক্ত নির্বাচন বর্জন করে। ৪র্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৮ সালের ৩মার্চ। এ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি ২৫১ টি আসন নিয়ে জয়লাভ করে। এ নির্বাচনটি অধিকাংশ প্রধান রাজনৈতিক দলই বর্জন করে। ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী। যেটি অনুষ্ঠিত হয় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি শাহাবুদ্দিন চৌধুরীর অধীনে। উক্ত নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি ১৪০টি আসন নিয়ে জয়লাভ করে। এ নির্বাচনে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগ সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ উত্থাপন করে। ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী। উক্ত নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ৩০০ আসন নিয়েই জয়লাভ করে। সকল রাজনৈতিক দলই উক্ত নির্বাচন বর্জন করে। ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালের ১২ জুন। যেটি অনুষ্ঠিত হয় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি হাবিবুর রহমানের অধীনে। উক্ত নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ ১৪৬টি আসন নিয়ে জয়লাভ করে। এ নির্বাচনে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি স্থূলকারচুপি তথা পুকুরচুরি হয়েছে মর্মে অভিযোগ উত্থাপন করে। ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০১ সালের ০১ অক্টোবর। এটি অনুষ্ঠিত হয় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমানের অধীনে। এ নির্বাচনে ২২৯টি আসন নিয়ে জয়লাভ করে বেগম খালেদা জিয়ার বিএনপি নেতৃত্বাধীন ০৪ দলীয় জোট। এ নির্বাচনেও বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগ
নির্বাচনী ফলাফল প্রত্যখ্যান করে। উপরন্তু প্রেসিডেন্ট, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং অপরাপর সদস্যমন্ডলীদের সংবিধান লঙ্ঘনকারী আখ্যায়িত করে তাদের বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উত্থাপন করে। ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর। এটি অনুষ্ঠিত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর ফখরুদ্দিন এর অধীনে। এ নির্বাচনে ২৬৩টি আসন নিয়ে জয়লাভ করে শেখ হাসিনার আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট। এটিকে নীল নকশার নির্বাচন বলে অভিহিত করে বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি। ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের ০৫ জানুয়ারী। এ নির্বাচনে বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। যেটিতে আওয়ামীলীগ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ আসনে জয়লাভ করে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর। এ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ ২৬৬ আসনে জয়লাভ করে। এটিও নির্বাচনের পূর্ব রাতেই ভোট সম্পন্ন হয়েছে মর্মেঃ অভিযোগ উত্থাপন করে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। এ থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, প্রায় সব নির্বাচনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বিশেষ করে যারা জয়ী হতে পারে নি, তারা নানা প্রশ্ন তুলেছে। নির্বাচন কমিশনগুলোর নিরপেক্ষ দায়িত্বশীলতা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। দেশ স্বাধীন হওয়ার অর্ধ শতাব্দী অতিক্রান্ত হতে চলেছে, তথাপিও দেশে নির্বাচন এর ক্ষেত্রে অদ্যাবধি একটি শক্তিশালী ও টেকসই নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে কেউ দলীয় সরকার, কেউ তত্ত্বাবধায়ক সরকার, কেউ সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি উত্থাপন করছে। অথচ এসবের কোনটিই সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়না। প্রকৃতপক্ষে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কখনও কোন সরকার নির্বাচন পরিচালনা করে না। নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। তাই বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৮ নং অনুচ্ছেদে একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেটি হচ্ছে- প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক ৪জন নির্বাচন কমিশনার লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রনীত যে কোন আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগ দান করিবেন। একই অনুচ্ছেদের (৪) উপধারায় বলা হয়েছে নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবে এবং কেবল সংবিধান ও আইনের অধীন হইবে। সুতরাং সংবিধানের এ ধারা অনুযায়ী সরকার নির্বাচন পরিচালনা করবে না। নির্বাচন এর সার্বিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে সরকারের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত একটি স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন কর্তৃক। তাই এক্ষেত্রে সরকারের নির্বাহী বিভাগের আওতামুক্ত থেকে নির্বাচন কমিশন যদি সার্বিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, কমিশনের কাজের সুবিধার্থে প্রয়োজন মোতাবেক সামরিক, আধা সামরিক ও আইন প্রয়োগকারী বাহিনী সরবরাহ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি বাধ্য থাকে, নির্বাচন কমিশনের সকল পরামর্শ-নির্দেশ যদি রেডিও-টেলিভিশনসহ সকল সম্প্রচার মিডিয়া ও কর্তৃপক্ষ যথার্থ প্রচারে বাধ্য থাকে, তবেই সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে কোনপ্রকার দ্বিধা-সংশয়ের অবকাশ থাকবে না। এছাড়াও সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর কোন বিকল্প সরকার গঠনের সুযোগ অবশিষ্ট নেই। তাই নির্বাচনের ক্ষেত্রে শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন ব্যাতিরেকে আর কোন উপায় নেই। এক্ষেত্রে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা প্রনিদানযোগ্য। ভারতে দলীয় সরকারের অধীনেই জাতীয় ও রাজ্যসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু নির্বাচনে পরাজিত দলগুলো কখনও নির্বাচন সংক্রান্ত কোনপ্রকার অভিযোগ উত্থাপন করে না। যার অন্যতম কারণ হচ্ছে সেদেশের স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন। যা আইন ও সংবিধান মোতাবেক পরিচালিত হয়। উপরন্তু এ কমিশন সরকার বা রাজনৈতিক দলের সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত থাকে। অনুরূপভাবে এদেশেও সংবিধান মোতাবেক একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, স্বয়ংসম্পূর্ণ, শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন করা হলে, তবেই নির্বাচন সংক্রান্ত সামগ্রিক জটিলতা নিরসন অধিকতর সম্ভব।

(Visited 8 times, 1 visits today)