শিরোনাম :
বায়তুশ শরফ আনজুমনে ইত্তেহাদের উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) এর প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত। জাফর আহমেদ খোকা মেহেরুননেছা ফয়েজ উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মনোনীত মিরসরাইয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন বাপ্পি চন্দ্র লোহাগাড়ার কৃতি সন্তান অধ্যক্ষ এম সোলাইমান কাসেমীর এম.ফিল ডিগ্রী অর্জন.. শ্রমিক নেতা গোলাম মাওলার মৃত্যু বার্ষিকী পালিত সাংবাদিক সংসদ কক্সবাজার’র বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার বাধ্যবাধকতা ছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থা অসম্পূর্ণ কক্সবাজার বিমানবন্দরের শাহ্ আবদুল মালেক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নামকরণের দাবি জাহাজী প্রবিন নেতা আবুল কাসেম সারেং এর ইন্তেকাল লেবাননে শান্তিরক্ষা মিশনে এ অংশ নিতে নৌবাহিনীর ৭৫ সদস্যের চট্টগ্রাম ত্যাগ

প্রভাব বিস্তারে মরিয়া ছয় আঞ্চলিক শক্তি

বিশ্ব রাজনীতির জ্বলন্ত কড়াই আফগানিস্তান : অধ্যাপক শাব্বির আহমদ

মার্কিন পরবর্তী আফগানিস্তানে তালেবান ও আশরাফ গণি সরকার রাজনৈতিক সমঝোতায় আসার জন্য কাতার ও ইরানে কয়েকবার বৈঠকে বসলেও কার্যত কোনো ফল আসেনি। আর এতে ধারণা করা হচ্ছে, বছরখানেকের মধ্যে তালেবানরা কাবুলের মসনদের দখলে নেবে। এমতাবস্থায় আফগানিস্তানে নিয়ন্ত্রণ বা নিয়ন্ত্রিত সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নানাভাবে তৎপর রয়েছে পাকিস্তান, তুরস্ক, চীন, ভারত, ইরান এবং রাশিয়ার মতো অর্ধডজন আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক পরাশক্তির দেশ। আজকের পরিসরে এ নিয়ে কিঞ্চিত আলোচনার প্রয়াস।
পাকিস্তান: 
পাকিস্তানের সাথে রয়েছে আফগানিস্তানের ২,৪৩০-কিলোমিটার সীমান্ত। পাকিস্তানে পশতুনরা দ্বিতীয় বৃহত্তম হলেও আফগানিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী। দেশ দু’টির পশতুভাষী জনগোষ্ঠীকে বিভক্ত করেছে ‘ডুরাল্ড’ নামক সীমান্ত লাইনটি। সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসনের সময় আফগানিস্তানের স্বাধীনতাকামী যোদ্ধারা পাকিস্তানের ভূখন্ড থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনা করতো। আর তাই আফগান গেরিলা গোষ্ঠীগুলোর উপর পাকিস্তানের উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিদ্যমান। ন্যাটোর আগ্রাসন চলাকালীন পাকিস্তান সরকার মাঝেমধ্যে দ্বৈতনীতির আশ্রয় নিলে আফগান গেরিলাগোষ্ঠীর একটি অংশ পাকিস্তানের প্রতি বিরূপ ধারণা পোষণ করা শুরু করলেও প্রধান প্রধান অংশগুলো পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই – এর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেছে বরাবরই। অবশ্য বর্তমান পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মার্কিনবিরোধী তীব্র মনোভাব তালেবান ও পাকিস্তান সরকারের সম্পর্ককে উষ্ণ করে তুলেছে। তারপরও পাকিস্তান তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। কেননা তালেবান দ্বারা প্রভাবিত পাকিস্তানী কিছু গেরিলা গোষ্ঠী শরিয়াহ্ আইন বাস্তবায়নের দাবিতে পাকিস্তান সরকারের সাথে বারবার সামরিক সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছে। পশতু জাতীয়তাবাদ উস্কে দিয়ে পাকিস্তান থেকে উত্তর – পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ দখলের উদ্দেশ্য কাজ করছে কিছু আফগান মিলিশিয়া। আর এই কাজে ভারত এবং বর্তমান আশরাফ গণি সরকার মিলিশিয়াদের সহায়তা করছে বলে অভিযোগ পাকিস্তানের। তাই পাকিস্তান মার্কিন পরবর্তী আফগানিস্তানের মাটিতে ভারত এবং বর্তমান সরকারকে দেখতে মোটেই আগ্রহী নয়। পাকিস্তানের পরিকল্পনা হলো, তালেবানরা ক্ষমতায় আসুক, তবে এককভাবে নয়; জাতীয় ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে। যে সরকার পাকিস্তানের উপর নির্ভরশীল থাকবে। তুরস্ককে পাশে রেখেই পাকিস্তান তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের অভিমত ।
চীন:
পাকিস্তানের অর্থনৈতিক মিত্র চীনও তাদের প্রভাবের বাইরে কোনো সরকার আফগানিস্তানের মসনদে আসুক- এমনটা চায় না। চীনের পশ্চিমে অবস্থিত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব তুর্কিস্তান (জিনজিয়াং) অঞ্চলটি বহু বছর ধরেই স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল। চীন নানাভাবে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দমন করে রেখেছে পূর্ব তুর্কিস্তানের মুসলিম ধর্মাবলম্বী উইঘুর জাতিগোষ্ঠীকে। গত বিশ বছরে ন্যাটো বাহিনীর বিপক্ষে তালেবানদের পক্ষে লড়াই করেন বহু উইঘুর মুসলিম। আফগানিস্তানে উইঘুরদের প্রতি সহানুভূতিশীল কোনো গ্রুপ যদি একবার শক্তভাবে মসনদে বসতে পারে, তবে এই উইঘুর মুসলিমরা আফগানিস্তান হতে স্বাধীনতার আন্দোলন নতুন করে শুরু করতে পারে বলে চীনের আশঙ্কা। চীনকে চাপে রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো জিনজিয়াং-এ চীনা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার। আর তাই আফগান ভূখন্ড হতে স্বাধীনতাকামী উইঘুরদের আক্রমণ শুরু হলে, চীন আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে পাশে পাবে না বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এছাড়া ইউরোপ ও আফ্রিকার সাথে বাণিজ্যিক দূরত্ব কমিয়ে আনতে চীন নির্মাণ করছে “চায়না-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর”। আফগানিস্তানকে এই করিডরের অন্যতম পার্টনার এবং মধ্য এশিয়ার “স্তান” রাষ্ট্রগুলোতে পৌঁছানোর রুট হিসেবে ব্যবহার করতে আগ্রহী চীন। কিন্তু আফগানিস্তানের মাটিতে চীন বিরোধী কোনো শক্তিশালী সরকারের উপস্থিতি চীনের এত বিরাট প্রকল্পকে হুমকিতে ফেলতে পারে।
তাই চীন তালেবানদের সাথে গভীর যোগাযোগ রক্ষা করার পাশাপাশি প্রস্তাব দিচ্ছে, তারা মসনদে আসার পর অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীন আফগানিস্তানের বিভিন্ন খনি থেকে খনিজ দ্রব্য উত্তোলনে কারিগরি এবং অর্থনৈতিক সহায়তা দান করবে। পাশাপাশি চীন নিশ্চয়তা পেতে চাই, তার সার্বভৌমত্বের জন্য তালেবান সরকার যাতে হুমকি না হয়।
ভারত: 
ভারতের অফিসিয়াল ম্যাপে আফগানিস্তানের সাথে ভারতের সীমান্ত থাকলেও ভারতের দাবীকৃত কাশ্মীরের গিলগিট – বাল্টিস্তান অঞ্চলটি পাকিস্তান দখলে রাখতে পারায় বাস্তবে কোনো সীমান্ত নেই। কিন্তু এরপরেও ভারতের স্থিতিশীলতা, বাজার ধরে রাখা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আফগানিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। প্রথমত, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের দিকে আফগান গেরিলাদের সবসময়ই চোখ ছিলো। তাই ভারত গত দিনগুলোতে চেষ্টা করে গেছে, আফগানিস্তানে যাতে ইসলামী গেরিলা সংগঠনগুলো ক্ষমতায় না আসে। দ্বিতীয়ত, ভারতের জন্য মধ্য এশিয়ার রাষ্ট্রসমূহের বিশাল বাজারে প্রবেশ করার গেটওয়ে হলো আফগানিস্তান। তৃতীয়ত, চিরশত্রু পাকিস্তানকে চেপে ধরতে হলে আফগান সরকারের উপর প্রভাব থাকা দরকার। এজন্য ভারত গত দুই দশকে মার্কিনপন্থী আফগান সরকারগুলোর পিছনে বিরাট বিনিয়োগ করেছে। পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প, সড়ক নির্মাণ, পার্লামেন্ট ভবন নির্মাণসহ আরো বেশ কিছু খাতে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ের পর আফগানিস্তানে গেরিলা সংগঠনগুলো ক্ষমতায় আসলে এই বিনিয়োগ থেকে ফায়দা লুটা দূরে থাক, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের আফগানিস্তানে প্রবেশ করতে পারাটাই কষ্ট হয়ে পড়বে। তাই ভারত বিভিন্ন মাধ্যমে নতুন করে আফগান গেরিলাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও এটা ভারতের চিরায়ত পররাষ্ট্র নীতির লঙ্ঘন! ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তর ইদানীং রাশিয়া, কাতার, ইরানে গিয়ে দফায় দফায় আফগান গেরিলাদের সাথে বৈঠক করছে। কিন্তু এতে কতটুকু কাজ হবে তা স্বয়ং ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ও নিশ্চিত না। আফগান গেরিলারা অবশ্য বিভিন্ন সময়ে বলে এসেছে বাইরের রাষ্ট্রের সমস্যায় তারা নাক গলাবে না। কিন্তু এরপরও ভারত নিশ্চিত হতে পারছে না। কারণ আফগান গেরিলাদের উপর পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের প্রভাব রয়েছে। সুতরাং চীন ও পাকিস্তানের মদদে আফগান গেরিলারা যদি কাশ্মীর প্রশ্নে ভারত বিরোধী নীতি গ্রহণ করে সেক্ষেত্রে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আর এজন্যই ভারত এখন দুশ্চিন্তায় রয়েছে অনাগত আফগানিস্তানের পরিস্থিতি অবলোকন করে।
ইরান: 
আফগানিস্তানের সাথে প্রায় সাড়ে নয়’শ কিলোমিটারের বিশাল সীমান্ত রয়েছে ইরানের।
দীর্ঘ মার্কিন অবরোধে সত্বেও দেশটি ইতোমধ্যেই কূটনৈতিক, ধর্মীয়, সামরিক দক্ষতায় মধ্যপ্রাচ্যের চারটি দেশ যথাক্রমে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনে উপর পুরোপুরি বা আংশিক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে সক্ষম হয়েছে। এসব দেশগুলোতে ইরানের প্রশাসনিক প্রভাব ও সামরিক বাহিনী রয়েছে। এছাড়াও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিয়া জনগোষ্ঠী থাকায় বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে এবং আফগানিস্তানে প্রভাব বৃদ্ধি করার চেষ্টায় সবসময় তৎপর ইরান। তালেবান ও ইরান উভয়ই দীর্ঘ সময় ধরে মার্কিন বিরোধী ব্লকের রাজনীতি করলেও অতীতে তাদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠেনি। কারণ, ইরান চায় মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে শিয়াদের আধিপত্য, অপরদিকে তালেবানরা সুন্নিপন্থী। আফগানিস্তানের জনসংখ্যার ১৫% অংশ শিয়া জনগোষ্ঠীরা শিয়া। হাজারাদের প্রতি ইরান বরাবরই সহানুভূতিশীল। তালেবান কর্তৃক অতীতে হাজারা শিয়াদের উপর হামলা এবং ১৯৯৮ সালে আফগানিস্তানের মাজার ই শরীফ শহরে হামলা চালিয়ে ইরানী দূতাবাসের নয়জন কূটনীতিককে হত্যার অভিযোগে ইরান তালেবানদের বিরোধিতায় সোচ্চার ছিল এতোদিন। বর্তমান ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় তালেবানরা আগের কঠোর শিয়া বিরোধিতা থেকে সরে এসেছে। ইতিমধ্যেই তাদের নিয়ন্ত্রিত একটি জেলায় শিয়া গভর্ণরও নিয়োগ দেওয়া হয়। ইরানও তার কৌশলগত মিত্রতা সৃষ্টি করতে চাচ্ছে তালেবানদের সাথে। এরই অংশ হিসেবে ইরানের মাটিতে সম্প্রতি আফগান সরকারের সাথে বৈঠক করে আফগান যোদ্ধারা। বাহ্যিক দিক থেকে ইরান সরকার এবং তালেবাদের মধ্যে সম্পর্ক ভালো তৈরি হলেও মধ্যপ্রাচ্যে শিয়াইজম প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত ইরানের সাথে আফগান তালেবানদের একটা মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব থেকেই যাবে। ইরান কখনো চাইবে না শক্তিশালী সুন্নী রাষ্ট্র হিসেবে আফগানিস্তানকে, তৎপর থাকবে সুন্নী দলগুলোর মধ্যে কোন্দল বাড়াতে।
রাশিয়া: 
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে জন্ম নেওয়া বর্তমান রাশিয়ার সাথে আফগানিস্তানের কোনো বর্ডার নেই। কিন্তু এরপরেও রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য আফগানিস্তানের গুরুত্ব রয়েছে। রাশিয়ার ককেশাস অঞ্চলের চেচনিয়া, দাগেস্তানসহ ৫টি মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশ রয়েছে। এই প্রদেশগুলোতে নব্বই এর দশকে স্বাধীনতার আন্দোলন জোরদার থাকলেও এখন মোটামুটি শান্ত। তালেবানরা ক্ষমতায় আসলে এই অঞ্চলগুলোতে আবারও স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হতে পারে বলে রাশিয়া ধারণা করে। নব্বই’র দশকে এসব অঞ্চলের স্বাধীনতার আন্দোলনে আফগান যোদ্ধারা সহায়তা করেছিলো। আফগানিস্তানের বর্ডার না থাকলেও মধ্য এশিয়ার বিশাল অরক্ষিত বর্ডার দিয়ে যাতায়াত তেমন কষ্টকর না। এছাড়া রাশিয়ার অভ্যন্তরে কাজাখ, উজবেক, তুর্কমেন, তাজিক ও কিরঘিজ জনগোষ্ঠীর বহু সংখ্যক মানুষ বসবাস করে। মধ্য এশিয়ার “স্তান” দেশগুলো সামরিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, শিক্ষাখাতে রাশিয়ার উপর নির্ভরশীল। আফগানিস্তানে যদি নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে, সেক্ষেত্রে মধ্য এশিয়াও অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। আর এর প্রভাব রাশিয়ার উপর গিয়েও পড়বে। রাশিয়া কর্তৃক আফগানিস্তানে সামরিক সংঘাতে জড়ানোর সম্ভাবনা মোটেই না থাকলেও নিজেদের স্থিতিশীলতার জন্য আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর সর্বদা নজর থাকবে রাশিয়ার। আর তাই বর্তমানে আফগান যোদ্ধাদের ক্রমবর্ধমান উত্থানের কারণে রাশিয়া তার পুরাতন শত্রুতা ভুলে তাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেছে। এমনকি এই অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করার লক্ষ্যে পুরাতন মিত্র ভারতের থেকে দূরে সরে গিয়ে বর্তমানে পাকিস্তানের সাথে অধিক ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে চলছে রাশিয়া।
তুরস্ক: 
সরাসরি সীমান্ত না থাকলেও কারণে তুরস্কের জন্য আফগানিস্তান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্য এশিয়ার “স্তান” রাষ্ট্র গুলোর মধ্যে তাজিকিস্তান ছাড়া বাকি চারটি বৃহত্তর তুর্কী জাতিগোষ্ঠীর রাষ্ট্র। তুরস্ক তাই এই রাষ্ট্রগুলোতে নিজের প্রভাব বৃদ্ধি করতে সচেষ্ট। তুর্কী জাতিগোষ্ঠীর রাষ্ট্র আজারবাইজানের সাথে সম্পর্ক খুব মধুর হলেও মধ্য এশিয়ার তুর্কী জাতিগোষ্ঠীর রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক ততোটা গভীরতায় নিতে পারেনি তুরস্ক। তাই মধ্য এশিয়ার সীমান্তবর্তী দেশ আফগানিস্তানে প্রভাব তৈরির মাধ্যমে মধ্য এশিয়ার ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিক ফিল্ডে আগমনের চেষ্টায় রয়েছে তুরস্ক।
অধিকন্তু, শরণার্থী ভারে জর্জরিত তুরস্ক। সিরিয়ান শরণার্থীর পরে সবচেয়ে বেশি যেদেশের শরণার্থী তুরস্কে অবস্থান করে তা হলো আফগানিস্তানের শরণার্থী। বর্তমানে প্রায় দেড় লাখ নিবন্ধিত আফগান শরণার্থী রয়েছে তুরস্কে। অনিবন্ধিত শরণার্থী আরো বহু সংখ্যক। আফগান শরণার্থীদের বেশিরভাগই বর্তমানে পাকিস্তান এবং ইরানে থাকে। মূলত পশতুন এবং হাজারা জনগোষ্ঠীর রিফিউজিরা পাকিস্তান এবং ইরানে আশ্রয় নিয়েছে। নতুন করে সংঘাত তৈরি হলে উত্তরাঞ্চলে বসবাসকারী তুর্কী জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি বাস্তুচ্যুত হবে এবং এদের বড় অংশের গন্তব্য হবে ইরান হয়ে তুরস্কে। এসব কারণ সমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তুরস্কের জন্য কৌশলগত কারণে আফগানিস্তান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তুরস্ক বর্তমানে আশরাফ গণি সরকার এবং তালেবানদের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার নিরন্তর চেষ্টা চালাচ্ছে। কাবুল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা দানের যুক্তি দেখিয়ে তুরস্ক তার সেনাদের আফগানিস্তানে রেখে যাওয়ার ঘোষণা দিলে মার্কিন প্রশাসন ও বর্তমান কাবুল সরকার খুশি হলেও তালেবানর তুর্কী সেনাদের অবস্থানের ঘোর বিরোধী। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের ধারণা, আফগানিস্তানে জাতীয় ঐক্যমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইমরান – এরদোগান অত্যন্ত সংগোপনে কাজ করে যাচ্ছে।তুরস্ক কর্তৃক কাবুল বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ প্রঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া এখনো পর্যন্ত জানা গেলেও পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে এরদোগান চুড়ান্ত কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হবে বলে মনে হয়না। যা হবে দু’দেশের সম্মতির ভিত্তিতেই হবে- এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যায়। সুতরাং এরদোগান-ইমরান পরিকল্পনা সফল না হলে আফগানিস্তানের ভবিষ্যত ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে- এই কথা নিশ্চিত করে বলা যায়। দৃশ্যপটে শুধু তালেবানকে দেখা গেলেও ৫০ বছর ধরে সংঘাতে জর্জরিত দেশটিতে অনেক সশস্ত্র গ্রুপ রয়েছে। আফগানিস্তানের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং উজবেক বংশোদ্ভুত একসময়ের দুর্ধর্ষ মিলিশিয়া কমান্ডার জেনারেল আব্দুর রশিদ দোস্তাম, ইঞ্জিনিয়ার গুলবদ্দিন হেকমতিয়ার, আহমদ শাহ মাসুদের ছেলের নেতৃত্বাধীন শক্তিশালী মিলিশিয়া গুলো সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে চরম হুমকির মুখে পড়বে আফগানিস্তানের অখন্ডতা। তুরস্ক তালেবানদের উপর্যপরি হুমকির কোন প্রতিক্রিয়া না দেখালেও গত ২১ জুলাই তুর্কী সাইপ্রাসে বিজয় দিবসের ভাষণ দেওয়ার সময় এরদোয়ান বলেছেন, “আফগানিস্তানে আমাদের কিছু নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের এবং আফগান যোদ্ধাদের (তালেবান) মধ্যে আদর্শগত কোনো বিরোধ নেই। তাদের সাথে সমঝোতা করেই আমরা আফগানিস্তানে থাকবো”। তবে, ‘নিজ ভাইদের এলাকা থেকে সরে যাওয়ার’ আহবানের মধ্য দিয়ে তালেবানদের প্রচ্ছন্ন হুমকিও দিয়ে রেখেছেন এরদোগান। এরদোগানের এই বক্তব্যের পর তালেবানদের সুরও আগের তুলনায় নমনীয় হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
পরিশেষে বলবো, বিশ্ব রাজনীতির জ্বলন্ত কড়াই আফগানিস্তানের বাতাসে বারোদের গন্ধ, মাটিতে রক্তের স্রোত কখন থামবে বলা মুশকিল। তারপরও প্রত্যাশা- আফগানিস্তানে আবারো শান্তি আসুক।
লেখক পরিচিতি: অধ্যাপক শাব্বির আহমদ, কলামিস্ট ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।
(Visited 43 times, 1 visits today)