মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে ৮ এপ্রিল || রংপুর সেক্টর ঘোষণা : মোহাম্মদ হাসান

মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে ৮ এপ্রিলঃ এ সময় মুসলিম লীগ নেতা কাজী আব্দুল কাদের পশ্চিম-পাকিস্তানে অবস্থান করছিল। কাজী কাদের এদিন করাচিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলে যে, পূর্ব-পাকিস্তানের সাম্প্রতিক অরাজকতার (মুক্তিযুদ্ধের) জন্যে শেখ মুজিব ও তার বেআইনি ঘোষিত আওয়ামী লীগ দায়ী। সে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের প্রশংসা করে বলে যে, তারা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের (মুক্তিযোদ্ধাদের) হাত থেকে দেশ ও জনগণকে বাঁচিয়েছে। পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণ দেশকে বিচ্ছিন্ন করে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার জন্যে ভোট দেয়নি। কাজী কাদের সমাজবিরোধী দুষ্কৃতিকারীদের (মুক্তিযোদ্ধাদের) খতম করে দেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে পূর্ব-পাকিস্তানি মুসলমানদেরকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করার আহবান জানায়।

পূর্ব-পাকিস্তান প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট শামসুল হুদা বলে যে, কোনো দেশপ্রেমিক মুসলমান পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে সম্প্রসারণবাদী ভারতের নির্লজ্জ ও অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না। ভারতীয় সরকারি রেডিও ‘আকাশবাণী’র প্রচারিত খবরকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও কল্পিত বলে উল্লেখ করে সে দৃঢ় আস্থা নিয়ে বলে যে, কোনো প্রচারণাই দেশপ্রেমিক পাকিস্তানিদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে পারবে না।

ন্যায্য অধিকারকে কেড়ে নিয়ে পাকিস্তানি শাসকচক্র এদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের উপর লেলিয়ে দেয় পাকী সেনা বাহিনীকে। অথচ জাতীয় পরিষদের সাবেক ডেপুটি স্পিকার এটিএম আব্দুল মতিন দেশের পরিস্থিতির জন্যে দায়ী করে ভারতকে। সে বলে যে, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থনে পার্লামেন্টে প্রস্তাব গ্রহণ, অনুপ্রবেশকারী পাঠানো এবং মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে ভারত গোলযোগ বাড়িয়ে চলেছে।

এ সময় গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাকী বাহিনী বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করে। বেপরোয়া বোমা বর্ষণের ফলে টার্গেট এলাকাসমূহ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এদিন ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশন্স ডাইরেক্টরেটর এক প্রেস রিলিজে পাকিস্তান বিমানবাহিনী বোমা বর্ষণের কথা অস্বীকার করে বলে যে, পূর্ব-পাকিস্তানের আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সশস্ত্র বাহিনীকে সাহায্য করেছে মাত্র, বিমানবাহিনী কেবল দুষ্কৃতিকারী ও অনুপ্রবেশকারীরা যেসব বাধা সৃষ্টি করেছে তা অপসারণ করেছে। কোনো শহর বা জনবহুল এলাকায় হামলা করেনি।

পাকী-চীন মৈত্রী সমিতির সভাপতি শেখ মমতাজ আহমদ খানের সভাপতিত্বে এদিন সমিতির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বরাবরের মতো এবার পূর্ব-পাকিস্তানের ঘটনাবলীতে প্রকৃত বন্ধুর ন্যায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়ার জন্যে গণচীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।

ইন্দোনেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা পূর্ব-পাকিস্তানে গণহত্যা চালানোর প্রতিবাদে সেখানকার পাকিস্তানি দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাত্রদের এ আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ‘পাকিস্তানে যা ঘটেছে তা তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এ ব্যাপারে আমাদের মাথা ব্যথার কোনো কারণ নেই।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এর তথ্য মতে, চাঁদপুরের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে হাজীগঞ্জ ডাক বাংলোতে পাকবাহিনী প্রতিরোধ নিয়ে এক বৈঠক হয়। এই বৈঠকে ডা. আবদুস সাত্তার, ড. আবু ইউসুফ, হাবিবুর রহমান, সাইদুর রহমান, বি.এম. কলিমুল্লাহ,আলী আহমদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
নোয়াখালীর ডেপুটি কমিশনার মঞ্জুরুল করিম পরিস্থিতি নিয়ে সুবেদার মেজর লুৎফর রহমানের সাথে আলোচনায় বসেন এবং নোয়াখালী প্রতিরক্ষার পরিকল্পনা তৈরি করেন।

ব্রিগেডিয়ার চিত্তরঞ্জন দত্ত ও ক্যাপ্টেন আজিজ সিলেট জেলা মুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
নড়াইল-যশোর রোডে দাইতলা নামক স্থানে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহতে পাকবাহিনী আক্রমণ চালায়। ৫ ঘন্টা স্থায়ী এ যুদ্ধে পাকবাহিনী আর্টিলারী ও মর্টার ব্যবহার করে। মুক্তিযোদ্ধারা গোলাবারুদের অভাবে পিছু হটে নড়াইলে অবস্থান নেয়।

রাত ১টায় সুবেদার বোরহানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি কোম্পানি লালমণিরহাট থানা হেড কোয়ার্টারে অবস্থারত পাকসেনাদের উপর অতর্কিতে আক্রমন চালায়।

পাকসেনারা ‘ফির্ডগান’ আর্টিলারি ও অন্যান্য আধুনিক অস্ত্রের সাহায্যে মুক্তিযোদ্ধাদের বদরগঞ্জ প্রতিরক্ষা ব্যুহে আক্রমণ চালায়। এ-যুদ্ধে তিনজন মুক্তিযোদ্ধা দেশের জণ্যে আত্মবিসর্জন দেন।

ভূষিরবন্দরে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের উপর পাকবাহিনী আক্রমণ চালায়। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে এবং দশ মাইল নামক স্থানে ডিফেন্স নেয়।
কুড়িগ্রামে ক্যাপ্টেন নওয়াজেশের উদ্যোগে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সম্মেলন হয়। সম্মেলনে কুড়িগ্রাম, রৌমারী, নাগেশ্বরী ও ভুরুঙ্গমারী এলাকা যে কোনো ত্যাগের বিনিময়ে মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং এই এলাকাকে রংপুর সেক্টর হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। রংপুর সেক্টরকে সুবেদার বোরহানউদ্দিনের নেতৃত্বে পাটগ্রাম এবং সুবেদার আরব আলীর কমান্ডে ভুরুঙ্গমারী এই দুটি সাব- সেক্টরে ভাগ করা হয়। রংপুর সেক্টরের দায়িত্বে থাকেন ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন।
ভারতীয় বিএসএফ বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা লে. কর্নেল লিমাইয়া মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত ও ক্যাপ্টেন আজিজের সাথে সাক্ষাৎ করেনএবং সামরিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শালুটিকর বিমানবন্দর এবং লক্কাতুরা এলাকা থেকে অগ্রসর হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন অবস্থানের উপর হামলা চালায়।
পাঁচদোনায় মুক্তিযোদ্ধাদের দৃঢ়প্রতিরক্ষা ব্যুহে পাকসেনারা আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণে পাকসেনাদল ১৫৫টি প্রাণ হারিয়ে এবং ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়ে পিছু হটে।
কালিহাতী সেতু এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা ও পাকবাহিনীর মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়। পাকবাহিনী বেশ ক্ষতি স্বীকার করে।

ভারতের ত্রিপুরায় বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য ৯টি শরণার্থী শিবির খোলা হয়।

জাতিসংঘে পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আগা শাহী জাতিসংঘের মহাসচিব উ’থান্টের কাছে প্রেরিত এক নোটে বলেন, ভারত পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করছে। ভারত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রত্যক্ষ মদদ যোগাচ্ছে।

ঢাকার সামরিক কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করে, পূর্ব পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী যে তৎপরতা চালাচ্ছে বিমান বাহিনী তাতে সাহায্য করছে। বিমান বাহিনী সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারী (মুক্তিযোদ্ধা)-দের আস্তানায় ও যানবাহনের উপর আঘাত হানছে । দুষ্কৃতকারীরা (মুক্তিবাহিনী) পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণভাবে যানবাহন চলাচলে অন্তরায় সৃষ্টির জন্য রাস্তায় যে প্রতিবন্ধক তৈরি করছে তা অপসারণ করা হয়েছে।

কালবিলম্ব না করে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে সমাজ ও রাষ্ট্রবিরোধীদের প্রতিরোধ করে দেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে-এ মর্মে কৃষক শ্রমিক পার্টির সভাপতি এ.এস.এম. সোলায়মান ঢাকায় এক বিবৃতি দেন।

মুসলিম লীগ নেতা কাজী আবদুল কাদের করাচীতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের সাম্প্রতিক অরাজকতার জন্যে শেখ মুজিব ও বে-আইনী ঘোষিত আওয়ামী লীগ দায়ী । তিনি সেনাবাহিনীর সময়োচিত হস্তক্ষেপের প্রশংসা করে বলেন, তারা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাত থেকে দেশ ও জনগণকে বাঁচিয়েছে।

জাকার্তায় ইন্দোনেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা চালানোর প্রতিবাদে সেখানকার পাকিস্তানি দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
দীঘি ইউনিয়নের মাইজখাড়া গ্রামে মো. মহারাজ, সেওতার মঙ্গল মিয়া, জয়ড়ার বাহেরউদ্দিন ও নোয়াখালীর আবদুল মান্নান মানিকগঞ্জের কালীগঙ্গা নদীর পারে পাকসেনাদের গুলিতে শহীদ হন । তারা সবাই তারাঘাটের সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মচারী । মানিকগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এটাই প্রথম শাহাদাৎবরণের ঘটনা।

তথ্যসূত্র: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর,।পূর্বদেশ, পাকিস্তান ৯, ১০ এপ্রিল ১৯৭১।
সম্পাদনাঃমোহাম্মদ হাসান,সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

(Visited 22 times, 1 visits today)