মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে ৬ এপ্রিলঃ নিক্সন-কিসিঞ্জারের প্রতিবাদ: মোহাম্মদ হাসান

মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে ৬ এপ্রিল ১৯৭১ঃ আজ নয়াদিল্লী তে এক প্রেস কনফারেন্সে দুইজন বাঙালি কূটনীতিক ২য় সচিব কেএম শিহাব উদ্দিন(পিএফএস ১৯৬৬) এবং সহকারী প্রেস এটাচে আমজাদুল হক পাকিস্তানি পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশ সরকারের আনুগত্য প্রকাশ করেছেন

৬ এপ্রিল ১৯৭১ ঐতিহাসিক মার্কিন দূতাবাস থেকে একটি তারবার্তা পাঠানো হয়েছিল ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে। ঢাকায় কর্মরত মার্কিন কর্মকর্তারা ২৫ শে মার্চের ‘কলঙ্কিত রাতের’ গণহত্যা এবং সে বিষয়ে নিক্সন-কিসিঞ্জারের অন্ধ ইয়াহিয়া-ঘেঁষা নীতির প্রতিবাদ জানাতে সংকল্পবদ্ধ হয়েছিলেন। তারা খুব ভেবেচিন্তে একটি তারবার্তা লিখেছিলেন যাতে স্বাক্ষর করেছিলেন ব্লাড ও তার ২০ জন সমর্থক সহকর্মী। তারা তাতে ঢাকায় ইয়াহিয়ার গণহত্যার প্রতি ওয়াশিংটনের অব্যাহত নীরবতার নিন্দা করেছিলেন। ব্লাড তাতে কেবল স্বাক্ষরই দেন নি, বাড়তি এক ব্যক্তিগত নোটও লিখেছিলেন। এতে তিনি লিখেছিলেন, “আমি বিশ্বাস করি, পূর্ব পাকিস্তানে এখন যে সংগ্রাম চলছে, তার সম্ভাব্য যৌক্তিক পরিণতি হলো বাঙালিদের বিজয় এবং এর পরিণতিতে একটি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা।“ এই ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ বস্তুত তখনকার নিক্সন-কিসিঞ্জারের দুর্গে বোমা ফেলেছিল। ‘’দ্য ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার’’ নামীয় গ্রন্থের লেখক ক্রিস্টোফার হিচিনসের মতে ‘মার্কিন ইতিহাসে ব্লাড টেলিগ্রামের কোনো তুলনা নেই।’ কিসিঞ্জার এ জন্য ব্লাডকে নির্বাসন দণ্ড দিয়েছিলেন।

ব্লাড টেলিগ্রাম (এপ্রিল ৬, ১৯৭১)—কে মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের অধীন পররাস্ট্র কর্মকমিশনের কর্মকর্তা কর্তৃক রচিত সর্বকালের সবচেয়ে শক্তিশালী শাব্দিক ভিন্নমত পোষণের গতিপথ (Dissent Channel) বার্তাসমূহের একটি হিসেবে দেখা হয়েছে।[১][২] ২৯জন আমেরিকান এতে স্বাক্ষর করেছিলো। টেলিগ্রাম থেকে অনূদিত:

“১- পূর্ব পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে অবস্থান তা বৃহত্তর অর্থে দেশটির নৈতিক স্বার্থ কিংবা ক্ষুদ্রতর অর্থে জাতীয় স্বার্থ দু’টোর কোনোটিই পূরণ না করায় – মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরকে স্বচ্ছ করার উদ্দেশ্যে নিয়োজিত টাস্ক ফোর্সের প্রস্তাবিত নীতির আলোকে -ঢাকাস্থ আমেরিকান কনসুলেট জেনারেল ইউএসআইএস এবং ইউএসএইড এর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের অণুসৃত নীতির মূল ধারার সাথে ভিন্নমত পোষণ করাকে কর্তব্য মনে করেন। আমাদের সরকার গণতন্ত্রের নিপীড়ন এবং নৃশংসতার বিরুদ্ধে নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের সরকার তার নাগরিকদের রক্ষার জন্য জোরদার ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে বরং উলটো তারা পশ্চিম পাকিস্তান শাসিত সরকারকে শান্ত করতে এবং তাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য এবং সঙ্গত নেতিবাচক আন্তর্জাতিক জনসংযোগের চাপ হ্রাস করতে নমনীয়তা প্রদর্শন করছে। আমাদের সরকার এমন এক সময়ে তার নৈতিক দেউলিয়াত্ব প্রদর্শন করছে যখন কিনা গণতন্ত্র রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক উপায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে নির্বাচিত দলের (ঘটনাক্রমে যারা পশ্চিমপন্থী) নেতাকে গ্রেফতারের নিন্দা এবং দমনমূলক ব্যবস্থা ও রক্তপাত বন্ধের আহবান জানিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন বার্তা প্রদান করেছে। আমাদের অতি সাম্প্রতিককালের পাকিস্তানকেন্দ্রিক নীতিতে আমাদের স্বার্থকে মূলত মানবিক বলে বিবেচনা করা হয়েছে। আমরা আওয়ামীলীগের সাথে সংঘাত যাকে কিনা দুর্ভাগ্যজনকভাবে বহুলব্যবহৃত শব্দ ‘গণহত্যা’ দিয়েও প্রকাশ করা যায়, সেটিকে সার্বভৌম রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ অভ্যন্তরীণ ব্যাপার হিসাবে দেখে এই ব্যাপারে কোনধরনের নৈতিক এমনকি মানবিক হস্তক্ষেপও না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সাধারণ আমেরিকানরা এ নীতিতে তীব্র বিরক্তি প্রকাশ করেছে। আমরা, পেশাদার সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে এই বর্তমান নীতির সাথে আমাদের মতের ভিন্নতা প্রকাশ করছি এবং আশা করছি যে আমাদের সত্যিকার এবং দীর্ঘস্থায়ী স্বার্থ এখানে রক্ষিত হবে এবং মুক্ত বিশ্বের নৈতিক পথপ্রদর্শক হিসাবে আমাদের জাতির অবস্থান উদ্ধার করা সম্ভব হবে।

২- আমাদের ভিন্নমতের সুনির্দিষ্ট অংশ এবং সাথে সেগুলো সম্পর্কে আমাদের নীতিগত প্রস্তাবসমূহ একটি আলাদা টেলিগ্রামে প্রেরণ করা হবে।

৩- স্বাক্ষর করেছেন: ব্রায়ান বেল, রবার্ট এল. বারকোয়েন, ডব্লিউ স্কট বুচার, এরিক গ্রিফেল, য্যাকারি এম. হান, জেইক হার্সবারজার, লরেন্স কোয়েজেল, জোসেফ এ. মালপেলি, উইলার্ড ডি. ম্যাকলেরি, ডিস্যাক্স ম্যায়ার্স, জন এল. নেসভিগ, উইলিয়াম গ্রাট পার, রবার্ট কার্স, রিচার্ড এল. সিম্পসন, রবার্ট সি. সিম্পসন, রিচার্ড ই. সাট্টর, ওয়েন এ. সুয়েডেনগার্গ, রিচার্ড এল. উইলসন, শ্যানন এল. উইলসন।

৪- আমি উপরোল্লিখিত কর্মকর্তাদের ভিন্নমত পোষণের অধিকারকে সমর্থন করি। যেহেতু তারা জরুরিভিত্তিতে তাদের ভিন্নমত প্রেরণ করতে চাইছিলেন এবং যেহেতু আমাদের টেলিগ্রাফ ছাড়া যোগাযোগের ভিন্ন কোন মাধ্যম নেই তাই আমি তাদের এ উদ্দেশ্যে একটি টেলিগ্রাম করার অণুমতি প্রদান করি।

৫- আমি বিশ্বাস করি পূর্বপাকিস্তানে কর্মরত সেরা মার্কিন কর্মকর্তা হিসাবে তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি মার্কিন সম্প্রদায়ের অধিকাংশের (সরকারি ও বেসরকারি) মতামত রূপে প্রতিধ্বনিত হয়। আমিও তাদের এই বক্তব্য সমর্থন করি কিন্তু আমি মনে করি না যে এখানকার প্রধান কর্মকর্তা রূপে বহাল থাকা অবস্থায় তাদের এই বিবৃতিতে আমার স্বাক্ষর করা উচিত হবে।

৬- তাদের অবস্থানের পিছে আমার যে সমর্থন তার অন্য একটি মাত্রা রয়েছে। যেহেতু পরবর্তীকালেও আরো প্রতিবেদন প্রেরণের আশা রাখি, তাই আমি বিশ্বাস করি পূর্বপাকিস্তানে যে সংগ্রাম চলছে তার সম্ভাব্য ফলাফল বাঙ্গালীদের বিজয় এবং এর ফলশ্রুতিতে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। এই মুহূর্ত আওয়ামী লীগের কাছে আমাদের সুনাম রয়েছে, অনমনীয় নীতির মাধ্যমে সম্ভাব্য পরাজিতের পৃষ্ঠপোষকতা করে এই সম্পদ স্বেচ্ছায় খোয়ানো বোকামি হবে। এ.ব্লাড।
(U.S. Consulate (Dacca) Cable, Dissent from U.S. Policy Toward East Pakistan, April 6, 1971, Confidential, 5 pp. Includes Signatures from the Department of State. Source: RG 59, SN 70-73 Pol and Def. From: Pol Pak-U.S. To: Pol 17-1 Pak-U.S. Box 2535;)

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এর তথ্য মতে,চট্টগ্রামের দোহাজারীতে মুক্তিবাহিনীর সাথে পাকসেনাদের প্রচন্ড সংঘর্ষ হয়। সংঘের্ষ মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে টিকে থাকতে না পেরে পাকসেনারা পিছু হটে যায়।
সিলেটের করিমগঞ্জ সীমান্তে মুক্তিবাহিনী ও পাকসেনাদের মধ্যে প্রচন্ড লড়াই শেষে পাকসেনারা পশ্চাদপসরণ করে বলে ঢাকায় সামরিক কর্তৃপক্ষ পরোক্ষভাবে স্বীকার করেন।
সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট পদগর্নি রক্তক্ষয় বন্ধের আহ্বান জানিয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টকে চিঠি দিলে জবাবে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বলেন, ‘পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে কাউকে হস্তক্ষেপ করতে দেওয়া হবে না।
পাকসেনারা অতর্কিতে চাঁদপুর, পুরানবাজারে বিমান থেকে বোমাবর্ষণ করে। এটাই ছিল চাঁদপুরে পাকবাহিনীর প্রথম বিমান আক্রমণ। এ হামলায় কোন প্রাণহানি ঘটেনি।

গোলাম আজম, হামিদুল হক চৌধুরীসহ একটি দল পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক ‘বেলুচিস্তানের কসাই’ নামে টিক্কা খানের সাথে দেখা করেন।
পাক বর্বররা সিলেট শহরতলীর কলাপাড়ায় এক গণ-নিধনযজ্ঞ পরিচালনা করে। ফলে ২৫ জন নিরীহ বাঙালি মৃত্যুবরণ করেন।

বেঙ্গল রেজিমেন্ট সদস্য ও ভাঙ্গার লোকজনসহ সুবেদার এ.কে.এম.ফরিদউদ্দিন আহমদ পাঁচদোনার শীলমন্দি নামক গ্রামে প্রতিরোধ গড়ে তোলন। অন্য দিকে পাকসেনারা ডেমরায় একত্র হয়ে মুক্তিবাহিনীর উপর আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নেয়।

পাকসেনারা সৈয়দপুর সোনিবাস থেকে দিনাজপুরের দিকে অগ্রসর হলে একসময় মুক্তিযোদ্ধাদের রাইফেলের আয়ত্বের মধ্যে চলে আসে এবং তুমুল গুলি বিনিময় হয়। দুই-তিন ঘন্টা স্থায়ী এ যুদ্ধে পাকসেনারা ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি স্বীকার করে সেনানিবাসে ফিরে যায়।

সন্ধ্যা ৬-৭টার দিকে মুক্তিযোদ্ধারা রাজশাহী শহর আক্রমণ করে। পাকবাহিনীর প্রবল গোলাবর্ষণ ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিবর্ষণের মুখে অদম্য সাহসী মুক্তিযোদ্ধারা সম্মুখে অগ্রসর হয় এবং শত্রুর ব্যুহ ভেদ করে শহরে ঢুকে। প্রায় চার ঘন্টা লড়াইয়ের পর রাজশাহী শত্রু মুক্ত হয় এবং মুক্তিযোদ্ধারা রাজশাহীর চতুর্দিকে প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তোলে। এ যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ‘রাজশাহী যুদ্ধ’ নামে খ্যাত।

গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ শিরোনাম-‘আলোচনা ভেঙ্গে যায়নি। ইয়াহিয়া চাননি মুজিব ক্ষমতায় আসুক। তাই তিনি বন্দুক নিয়ে নামলেন।’

আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সার-সংক্ষেপ:
বাংলাদেশ পূর্ব রণাঙ্গন: পূর্ব রণাঙ্গনে মুক্তিফৌজ ৪৮০ কি.মি. দীর্ঘ ঢাকা-শ্রীহট্ট রেলপথটি নানা জায়গায় বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, ফলে শ্রীহট্ট শহরে অবরুদ্ধ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছে ঢাকা থেকে অস্ত্রশস্ত্র ও রসদ পাঠানো অসম্ভব করে তুলেছে।
ময়মনসিংহ মুক্তিফৌজের হাতে। সংলগ্ন নতুন জেলা টাঙ্গাইলের অবস্থাও তাই। মুক্তিফৌজ কুমিল্লা শহরও দখল করছে। পাকফৌজ শহর ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে।

বাংলাদেশ-পশ্চিম রণাঙ্গন: পশ্চিম রণাঙ্গনের কুষ্টিয়ায় প্রচন্ড লড়াই চলে। যশোরের চাচড়ার মোড় পুনর্দখলের জন্য জোর লড়াই শুরু হতে চলেছে। খুলনায়ও উভয় পক্ষে মরণপণ সংগ্রাম চলছে।

বাংলাদেশ-উত্তর রণাঙ্গন: উত্তর রণাঙ্গনে মুক্তিফৌজ একটি সাফল্য অর্জন করেছে-তারা হানাদার বাহিনীর হাত থেকে রংপুর শহরটি ছিনিয়ে নিয়েছে, তিস্তা সেতু উড়িয়ে দিয়েছে, লালমনিরহাট বিমান ক্ষেত্র অকেজো করে দিয়েছে। সামরিক দিক থেকে এ সাফল্যের তুলনা নেই। রাজশাহীতেও জোর লড়াই চলছে। বগুড়া ও পাবনা জেলা হানাদার মুক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ-দক্ষিণ রণাঙ্গন: চট্টগ্রামে আবার প্রচন্ড লড়াই শুরু হয়েছে মুক্তিফৌজ ও হানাদার ফৌজের মধ্যে। পাক বিমান বোমা ফেলেছে চট্টগ্রাম শহরে। নোয়াখালি জেলার নানা অঞ্চলেও উভয় পক্ষ মুখোমুখি। বরিশাল জেলার লড়াই হঠাৎ প্রচন্ড আকার ধারণ করেছে।

তথ্যসূত্র: মুক্তি যুদ্ধ জাদুঘর ও মুক্তিযুদ্ধের কাল পঞ্জি।
সম্পাদনাঃ মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

(Visited 18 times, 1 visits today)