শিরোনাম :
বিজিএমই সহ-সভাপতি রাকিবুল আলম চৌধুরী নারায়ণহাট মাদ্রাসার সভাপতি নির্বাচিত সিলেট সুনামগঞ্জ বানভাসীদের মাঝে ফেনী জেলা ‘নিজের বলার মত গল্প ফাউন্ডেশন’ এর ত্রাণ বিতরণ স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে চবি কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত পদ্মা সেতু উদ্বোধন || প্রধানমন্ত্রীকে চট্টগ্রাম ট্রিবিউন পরিবারের অভিনন্দন মানবতার নায়ক আবদুস সামাদ স্যার, সবার জন্য অনুসরনীয় রামগঞ্জে খালের উপর থাকা নির্মাণাধীন দুইটি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছে স্বামী-স্ত্রী মাদক কারবারী, বিশেষ অভিযানে ৫মাদক কারবারী লোহাগাড়ার শ্রীঘরে, ইয়াবা জব্দ বান্দরবানে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন আজ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী যান্ত্রিক এবং মানবিক ত্রুটি দূর করতে পারলে ইভিএম গ্রহণযোগ্য হবে

সফলতার আরেক নাম মরিয়ম : সুমন চক্রবর্ত্তী

নেতৃত্বের গুণ সবার থাকে না, যেই মেয়েটির কথা বলছি তার পিতৃপ্রদত্ত নাম মরিয়ম। লাজুক স্বভাবের মেয়ে বলতে যা বুঝায় মরিয়ম ঠিক তাই ।কখনো নিজেকে ছোটগল্প বানাতে চায় না। গল্পের রাজা হতে কতোবার স্কুল আর বাড়ি গিয়ে কেদেঁছে তার হদিস নেই। সে চাইলেই অনায়াসে ক্লাশ ক্যাপ্টেন ও স্টুডেন্টস্ কেবিনেট নির্বাচনে দাঁড়াতে পারতো। কিন্তু দাঁড়ায় নি। কারণ যে বন্ধুটি তার ক্লাশ থেকে প্রতিনিধিত্ব করবে সেও তার খুব আপন বন্ধু । মানসিকতার দিকে সে খুবই সার্ব্বজনীন। সবারটা দেখেই তার পথ চলা। একবার প্রতিষ্ঠান প্রধানের পরামর্শে সরকারি প্রজ্ঞাপনে মরিয়মসহ রেডক্রিসেন্টের ক্লাশ টেনের মেয়েদের নিয়ে একটা পরিচ্ছন্নতা কমিটি গঠন করা হয়। মরিয়ম তার মাঝে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। কতোবার সে ঘরে বাইরে বকা খেয়েছে তার কোন হদিস নেই। ছোটরা অনেক সময় না বুঝে বলে উঠতো -এটা কি ঠিক হচ্ছে আপু? মরিয়ম কখনো কিছু বলতো না। সেই ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত সবাই থাকে এক নামেই চিনে। একবার কি হলো, সে স্যারের সহযোগিতায় সিদ্ধান্ত নিলো এবারের অমর একুশে হবে পরিচ্ছন্নতার একুশ। স্কুলে যথেষ্ট পরিচ্ছন্নতা সামগ্রীর অভাব ছিলো। কারণ এতো কিছু নিতে গেলে স্কুল ফান্ড থেকে এতো বরাদ্দ সম্ভবপর নয়। একবার স্যার বলেছিলো- একজনের একশত টাকা দিতে অনেক কষ্ট, কিন্তু রাস্তার ভিক্ষুককে আমরা যে কেউ এক টাকা দিতে পারি। সবার সহযোগিতায় ১ টাকা করে দেওয়ার ইচ্ছা আসলে আমাদের প্রিয় স্কুলটাতে অনেককিছু করা যায়। স্যারের কথাটা শুনে খুব ভালো লাগলো মরিয়মের। সে নিজ থেকেই প্রস্তাব দিলো আমরা কিছু করবো, স্যার। প্রতিষ্ঠান প্রধানের অনুমতি নিয়ে একটা পরিকল্পনা করলো কিভাবে কি করা যায়? কাজে থাকলে মন ভালো থাকে। এদিকে মরিয়ম সবসময় বলতো – স্যার, কোন পরিকল্পনাই দিলেন না। তখন স্যার বললো। দেখো কথায় আছে- ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না। কাজ করতে পরিশ্রমের সাথে অর্থের দরকার। আর টাকার কথা আসলেই যতো সমস্যা। কিন্তু সবার মনটা যদি এক হয়, সেরা কিছু হবে। পাথরেরও কিন্তু মন আছে। একটা মেয়ে পারে না এমন কোন শব্দ নেই। যদি চাও সেরাটা হবে। টাকা নয় প্রাণান্ত চেষ্টা ও স্বদিচ্ছা তোমাকে সামনে এগিয়ে চলার পথ দেখাবে। তোমরা ২০২০ এর শেষ ব্যাচ। একটু দরদ দিলে পুরো স্কুল নতুন সাজে সাজবে। মরিয়ম ক্লাশে বসেই কাঁদতে লাগলো। ওর চোখের জলটা সবাই দেখে না। কাঁদতে কাঁদতেই দাঁড়িয়ে গেলো – আমরা কখনোই কিছু করতে পারবো না,স্যার। তখন স্যার বললো- তোমার করাটা এক্ষুণি শুরু হয়েছে। প্রানান্ত আবেগ না আসলে করাটা শুরু হয়ে উঠে না। এখন তুমি পারবে-দেখো এখন তোমার সাথে কে আছে? সবাইকে স্যার জিজ্ঞেস করলো – তোমরা কি পারবে? সবাই দাঁড়িয়ে গেলো। হে স্যার। মরিয়মের চোখের জলে যেন বান ধরেছে। সীমাহীন আবেগী একটা মেয়ে। তার অপমান সহ্য করার ক্ষমতা একদম আলাদা। গন্ডারের চামড়াও এতো মোটা হয় না। যাহোক স্যারের তত্ত্বাবধানে একটি পরিচ্ছন্নতা কমিটি গঠন করা হলো। তারা পুরো স্কুলকে শ্রেণিতে ভাগ করে ফেললো। সব শ্রেণিতে ৫ জনের সাব কমিটি। এ যেন চোখের নিমেষেই হয়ে গেলো। ফেব্রুয়ারি আসতে আরো দেড়মাস বাকি। এবারের অমর একুশে মানেই হলো- পরিচ্ছন্নতা। এই কয়দিন মরিয়ম ঘুমাতে পারে নি- রাতে। ভাবতো কাজটা যতো সহজ ভাবছি -হবে তো? আবার চিন্তা করতো – স্যারতো সাথে আছে; আমাদের সাথে। এতো চিন্তা কিসের? তবুও সে ভাবের ঘোরে খুব আনমনা হয়ে যেতো। তার এই আনমনা স্বভাবের জন্য সে অনেক কথা শুনতো স্যারদের কাছ থেকে। আসল কথা সেটি নয়। তার ভাবনা হলো অমর একুশে। এটা ভেবে ভেবেই সে কতোবার ক্লাশে ক্লাশে ঘুরে বেড়াতো- তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কোন ক্লাশ থেকে ৩০ জন ১ টাকা দিয়েছে। কি যে খুশি হতো সে? সে তার যুব রেডক্রিসেন্ট বন্ধুদের বলতো আমি কিন্তু তোদের চাই। আমাকে তোদের সেরাটা দিতে হবে। আমি এবারের অমর একুশে স্যারকে যেকোনোভাবেই উপহার দিবো। কি বলিস বোকা? ইমা, লুবাবা, মন্দিরা,তানিয়া ও হামিদা ওকে খুব সাহস দিতো। দেখিস বোন সব এমনিতেই হয়ে যাবে। কোনো চেষ্টা বিফলে যায় না। এদিকে সময়ও মাত্র ২১ দিন বাকি। মরিয়ম আবার স্যারের কাছে এলো। স্যার এতো কম সময়ে মনে হয় পারবো না। টাকা পয়সাও উঠছে না। স্যার বললো – তুমি টাকা নিচ্ছ কেন? সবার মনটা নাও- টাকার অভাব হবে না। মুহূর্তেই মরিয়মের নতুন আবিস্কার মন। বন্ধুদের নিয়ে সে শুরু করলো সেরা অভিযাত্রা। ৫ দিনে দেখলো যা তুলেছে, তার দ্বিগুণ। সে এসে মুচকি হাসছে। স্যার আপনিই ঠিক। মনের জাদুটা ম্যাজিকের মতো কাজ করছে। মরিয়মের তৃপ্তিটা ছিলো ছোট বাচ্চাটার মতো অসীম। এটার কোন পরিসংখ্যান ছিলো না। মরিয়মের সেরা সহযোগি ছিলো হামিদা। মরিয়মের ভালোবাসাকে সময় দিতে গিয়ে সেও অনেক কষ্ট পেয়েছে। মাঝে মাঝে হামিদাকে মরিয়ম চোখের ইশারায় বলতো কষ্টগুলো এইরকমই আকাশে পাখি উড়ার উড়ন্ত ইচ্ছার মতো। শুধু নিজে উড়ে না ; অন্যকে ও উড়ায়। এই কয়দিন তারা অনেক খুশি। কিন্তু সময় হচ্ছে ১০ দিন। ১৬ তারিখে সব না করলে একুশ তারিখ কিভাবে হবে? তারা আবার গেলো- স্যার কিছুই হচ্ছে না। টিফিন ঘন্টায় মরিয়ম ও তার টিমের সাথে স্যার গেলো প্রতি ক্লাশে ক্লাশে। শুধু একটি কথাই বললো – দেখি এবারের শহীদদের স্মরণে কোন ক্লাশ আগে পরিচ্ছন্নতায় সামিল হয়। শহীদ দেরকে কারা আগে পরিচ্ছন্নতা উপহার দেয় দেখা যাক। পরিচ্ছন্নতার আবেশে সেরা ক্লাশ হয় কোন শ্রেণি দেখি এবার। এবার মরিয়ম বুঝতে পারলো, টাকা নয় মনের সাথে সবার উদ্যম বাড়াতে হবে। সে প্রতিটা মেয়ের এতো কাছে গেলো; খুব অল্পেই সে সবার প্রিয় হয়ে উঠলো। এবার একুশটা আমরা সাজাতে চাই। দেখি স্কুলটা কতো পরিচ্ছন্ন হয়। যথাসময়ে দিন গুনিয়ে আসলো। মরিয়ম টাকা গুনে কুল করতে পারলো না। তারপর ও দেখে হলো না। অগত্যা স্যারের কাছে এলো। স্যার পারলাম না। এই নিন, কিন্তু এতে তো সব হবে না। স্যার বললো চিন্তা করো না,একটা ব্যবস্থা ঠিকই হবে। তুমি তোমার গ্রুপ নিয়ে কাজ করো। আর আমাকে টাকাটা দাও। দেখি কি করতে পারি? অবশেষে ১৬ তারিখ বিকেল বেলা তাদের সম্মিলিত টাকা ও স্যারের নিজস্ব কিছু অর্থায়নে সবকিছু কেনা হয়ে গেলো। পরিষ্কার সামগ্রীর লেবেল থেকে শুরু করে সমস্তকিছু স্যার সংগ্রহ করলো। ওইদিন এসব জিনিস ক্রয়ের সময় হানিফ স্যার ও রনজিত স্যারের সাথে পথে দেখা হলো। স্যারেরা খুব আনন্দ পেলো এমন আবহে। পরেরদিন সবার আগে মরিয়ম উপস্থিত। স্যার, পারলাম না। স্যার বললো- মরিয়ম, শিক্ষক মিলনায়তনে যাও ও দেখো। মরিয়ম দেখে হতভম্ব। চোখ দিয়ে শুধু জলে ভেজা। যেনো কিছুক্ষণ আগে একপশলা বৃষ্টি হয়েছে। সে কৃতজ্ঞতায় বলে ফেললো, স্যার ক্ষমা করবেন। আপনার কাছে আমি ও আমার সকল গ্রুপের মেয়েরা আরেকবার ঋণী হয়ে গেলাম। স্যার শুধু এতোটুকুই বললো, দেখো তোমাদের ইচ্ছাই তোমাদের মূল্য দিলো। পরের দিন তারা বিদ্যালয়ের ওয়াশরুম গুলোকে প্রধান শিক্ষকের অনুমতিক্রমে স্যারের সহযোগিতায় শ্রেণিভিত্তিক আলাদা করলো ও সকল শ্রেণিতে পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী পৌঁছে দিলো এবং ১৯ শে ফেব্রুয়ারি মরিয়ম তার টিমের সাথে বসলো। বললো- দেখো আর মাত্র দুইদিন। পুরো স্কুলে এখনো মেয়েরা ময়লা করে। আমাদের আরো আন্তরিক হতে হবে। সব ক্লাশে গিয়ে বললো দেখি কোন ক্লাশ প্রথম হয়। আমরা স্কোরবোর্ডে ১ম, ২য় ও ৩য় নির্ধারণ করবো। দেখি কারা ভাষাশহীদদের প্রকৃত ভালোবাসে। ২০ শে ফেব্রুয়ারি যখন মরিয়ম স্যারের কাছে গিয়ে বললো। স্যার আমাদের প্রতিটি ক্লাশ তৈরি ২১শের জন্য। আপনি একটু দেখলে স্যারদের সবাইকে বলবো। স্যার যখন গেলো মেয়েদের এতোবড়ো কাজে অান্তরিক অংশগ্রহণ দেখে খুবই প্রশংসা করলো। ফ্যান থেকে শুরু করে বিদ্যালয়ের মেঝ পর্যন্ত সব যেনো আয়নার মতো জ্বলজ্বল করছে। মরিয়ম- স্যার, ময়লার ঝুড়িগুলো বসানো হয়েছে। স্যার, মরিয়মের দিকে থাকিয়ে বললো সত্যি তোমরা সেরাটা করেছো। এবারের শহীদ দিবস অনেক প্রেরণাদয়ক হবে। গল্পের মতো হারিয়ে গেলো মরিয়ম। অনেকদিনের জমানো কষ্টগুলো আগামীকাল নতুন রূপ নিবে। এদিকে প্রতিটি ক্লাশে গিয়ে বললো দেখো বোন, এখনো আমরা স্যারের সব টাকা দিতে পারি নি, চেষ্টা করো। কাল সময় আছে। যথারীতি অমর একুশের শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়ে সব শিক্ষকদের নিয়ে স্যার এলেন,তখন মরিয়ম হাতে কিছু টাকা নিয়ে দেনাপূরণের দায়ে কাঁদছে। স্যার সবাই চলে গেলে মরিয়মকে বললো- মনে রেখো মরিয়ম তুমি যা করেছে সেটা তোমার মন প্রাণ উজাড় করা কোন কিছু। মরিয়ম হয়তো স্কুল ক্যানভাসে আর কখনো পা দিবে না, কিন্তু মরিয়ম যা করেছে সেটা একদিন কর্মপ্রেরনা হয়ে ছড়িয়ে পড়বে একজন থেকে আরেকজনে। সফলতার আরেক নাম মরিয়ম।

(Visited 194 times, 1 visits today)